নতুন চুক্তিতে ’৭৭ সালের ধারা যুক্ত করার তাগিদ

পরিবর্তিত পরিস্থিতি আর নতুন বাস্তবতা সামনে নিয়ে ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সই করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ১৯৭৭ সালে সম্পাদিত চুক্তির আলোকে গ্যারান্টি ক্লজ বা সুরক্ষার ধারা ফিরিয়ে আনতে হবে। এর পাশাপাশি পানিবণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থে তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় জোর দিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীতে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সামনে রেখে আয়োজিত এক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত দিয়েছেন। ‘গঙ্গার পানিচুক্তি: পুনঃ আলোচনার বিষয়াবলি’ শীর্ষক ওই সেমিনারের আয়োজন করে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া)। সেমিনারে ভারতের সঙ্গে চুক্তিটি নতুন করে সইয়ের আগে দর-কষাকষিতে সক্ষমতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক আইনকে কাজে লাগানোর পক্ষেও মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, ‘আগামী মাসে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে যাবেন, তখন ওই চুক্তির বিষয়ে (গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি) বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরবেন বলে আশা করি। সেখানে আমাদের অধিকার, স্বার্থের বিষয়ে দৃঢ় বক্তব্য তাঁকে তুলে ধরতেই হবে।’ তিনি বলেন, সমন্বিতভাবে দেশের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দিক থেকে যদি আইনের আশ্রয় নিতে হয়, সেটাও করতে রাজি আছে ঢাকা।

পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৭ সালে প্রথম যে চুক্তিটা হয়েছিল, তাতে আমাদের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়েছিল। চুক্তিটিতে গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত ছিল। কিন্তু ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৪ ও ১৯৮৫ সালে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। সেখানে কোনো গ্যারান্টি ক্লজ ছিল না। আর ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ বাদ দেওয়া হলো।’ তিনি বলেন, এই গ্যারান্টি ক্লজ না থাকায় বাংলাদেশ বঞ্চিত হয়েছে।

শহীদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তিতে ১৯৭৭ সালে বাতিল হয়ে যাওয়া গ্যারান্টি ক্লজ পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। ভবিষ্যতে সব চুক্তিতে তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সম্পর্কের সমালোচনা করেন পানিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বন্ধুদের আরও বেশি সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশের মানুষের অনুভূতি ও দেশের স্বার্থকে সম্মান করেই সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হবে।’

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ‘গঙ্গা চুক্তি: প্রয়োজন নতুন ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে তিনি বলেন, গঙ্গা অববাহিকার প্রায় ৭০ শতাংশই ভারতের উত্তর প্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ কাঠামোগতভাবেই একটি নিম্ন-অববাহিকার দেশ। উজানে ভারতের ব্যাপক সেচ প্রকল্প সম্প্রসারণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহে চরম তারতম্য দেখা দেয়।

আসিফ নজরুল ১৯৭৭ সালের চুক্তির গ্যারান্টি ক্লজের তুলনায় ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ন্যূনতম পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা না থাকাকে একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখান, নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের হিস্যা প্রায় ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ কমেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ২০০৮-২০১৬ সালের মধ্যে ২৭টি সংকটকালে ১৫ বারই বাংলাদেশ ন্যূনতম পানিপ্রবাহ পায়নি এবং বিদ্যমান চুক্তিতে তথ্য অধিকার, পরিবেশগত সুরক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নেই। আসিফ নজরুল তাঁর প্রবন্ধের শেষে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি সামনে রেখে সুনির্দিষ্ট কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন।

নির্ধারিত আলোচক স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পানির চাহিদা কতটুকু, তা পর্যালোচনা করে দাবি উত্থাপনের ওপর জোর দেন।

Post a Comment

0 Comments