
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে খুনের ঘটনার মতো একটি হত্যাকাণ্ড ঘটে গত জুনে। লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের সেই ঘটনায় (গত ২৫ জুন) মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করেন এক যুবক।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)।
শুধু রংপুর ও লক্ষ্মীপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে গত ছয় মাসে (২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট)। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। কোনো ক্ষেত্রে এক পরিবারের দুজন, কোনো ক্ষেত্রে তিনজন, কোনো ক্ষেত্রে চারজন এবং কোনো ক্ষেত্রে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদাভাবে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে সাতটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো ঘটনায় সম্পত্তি বা জমির বিরোধ এবং কোনোটির সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক সামনে এসেছে। কোনোটি দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহের কারণে ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ। কোনো কোনো ঘটনার কারণ এখনো অজানা।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একের পর এক একসঙ্গে একাধিক খুনের ঘটনা মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব ঘটনার একটির সঙ্গে অন্যটির মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যাবে, মিল রয়েছে।
যেমন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। এতে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এমন ভয়ংকর মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে আসক্তদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।
বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, বাংলাদেশে জমির বিরোধ একটি বড় সমস্যা। সরকারগুলো এই বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ করতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে জমির বিরোধের কারণে দেশে বহু সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।
অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একেক ঘটনার কারণ একেক রকম। তবে প্রতিটির পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার সঙ্গে অপরাধের ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং বিচার না হওয়াও এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম কারণ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, দা হাতে এক যুবক দুপুর ১২টার দিকে ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেন। এতে দুজনের মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলেই। দুজন মারা যান হাসপাতালে। অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার।
হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে মারধর করে। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তর মজুমদার কেন চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করলেন, তা এখনো অজানা। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্তর মাদকাসক্ত ছিলেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মাদকের টাকার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পাঁচ দিন পর আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় রায়পুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, প্রায় সাত-আট বছর ধরে অন্তর মাদকাসক্ত। তিনি বাড়িতে মাদকের টাকার জন্য বাবা-মাকে মারধর করতেন।
এদিকে রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনার সঙ্গেও মাদককে সামনে এনেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
যদিও এ ঘটনার আসল কারণ এটাই কি না, তা নিয়ে মানুষের সন্দেহ রয়েছে। মঙ্গলবার মামলাটি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গত ২৫ জুলাই খুন হন স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত (৫৫)। হত্যার অভিযোগ তাঁদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, মাদকাসক্ত রিমন দীর্ঘদিন ধরে বেকার। চাকরি নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। অর্থাৎ, এ ঘটনায় মাদকাসক্তি ও বেকারত্বের মতো দুটি সামাজিক সমস্যা সামনে আসে।
সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিজ বাসায় ১২ আগস্ট সকালে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২০) খুন হন। এ ঘটনার দিন বিকেলেই পুলিশ রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের একজনকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রি ও কসাইয়ের কাজ করতেন বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। প্রাথমিকভাবে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে ১৫-২০ দিনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বাবুল মিয়ার। সম্পর্কে মনোমালিন্যের জেরে বাবলু মিয়া প্রথমে তাহমিনা এবং পরে দম্পতিকে খুন করেন। তবে পুলিশের এমন দাবি মানতে নারাজ ছিলেন নিহত দম্পতির স্বজনেরা।
হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটক বাবুলের নাম উল্লেখ করেননি। এজাহারে তিনি জমি নিয়ে বিরোধ এবং সে কারণে হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। যদিও পুলিশ বলছে, ২০ আগস্ট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবুল মিয়া।
গত ছয় মাসে আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা-সৎভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ এসেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ার পাঁচ খুনের এক আলোচিত ঘটনায় নিহত এক নারীর স্বামীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
প্রথম আলো যে ১৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ১২টি ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে নিহত হয়েছেন। একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন দুই ঘটনায়, চারজন করে তিন ঘটনায় এবং পাঁচজন নিহত হয়েছেন এক ঘটনায়।
ছয় মাসের ১৮টি ঘটনার মধ্যে মে মাসেই ঘটেছে পাঁচটি। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও স্বজনের সঙ্গে হত্যার শিকার হওয়ার পাঁচটি ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, শুধু মে ও আগস্টেই ১০ ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন। ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত সাতটি হুমকি ও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনা বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর বা আবাসস্থলে ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ঘরেও কি মানুষ নিরাপদ নন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তাবোধ আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির বিষয় নয়; একজন মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, ঘরের ভেতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তাই পুলিশ খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। আর এই অপরাধের একটি অংশ এখন ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় থেকে সংঘটিত হচ্ছে, যেগুলো অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরে ঘটে।
শাহাদাত হোসাইন বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়; অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করা নিয়েও কাজ করছে পুলিশ।
অবশ্য মানুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। যেমন গত ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশু হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন কিশোরের পরিবারের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ লোকজন। গণপিটুনিতে ওই কিশোরের বাবা ও চাচা নিহত হন।
অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়। ‘হত্যা মামলার সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বছর মে মাসে জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে সাইমা আক্তার (২১), ইকরা (১৭) ও সিপা (১০)।
শুধু রংপুর ও লক্ষ্মীপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গায় একই পরিবারের একাধিক সদস্য খুন হওয়ার ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে গত ছয় মাসে (২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ আগস্ট)। এসব ঘটনায় অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। কোনো ক্ষেত্রে এক পরিবারের দুজন, কোনো ক্ষেত্রে তিনজন, কোনো ক্ষেত্রে চারজন এবং কোনো ক্ষেত্রে পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরে আলাদাভাবে একই পরিবারের একাধিক সদস্য হত্যার পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ১৮টি ঘটনা পাওয়া গেছে সাতটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, কোনো ঘটনায় সম্পত্তি বা জমির বিরোধ এবং কোনোটির সঙ্গে মাদকের সম্পর্ক সামনে এসেছে। কোনোটি দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহের কারণে ঘটেছে বলেও উল্লেখ করেছে পুলিশ। কোনো কোনো ঘটনার কারণ এখনো অজানা।
সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, একের পর এক একসঙ্গে একাধিক খুনের ঘটনা মানুষের মনে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তৈরি করছে। আপাতদৃষ্টিতে এসব ঘটনার একটির সঙ্গে অন্যটির মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে দেখা যাবে, মিল রয়েছে।
যেমন নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতায় মাদক সহজলভ্য হয়ে গেছে। এতে মাদকাসক্ত ব্যক্তির সংখ্যা বাড়ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে। এমন ভয়ংকর মাদক ছড়িয়ে পড়েছে, যাতে আসক্তদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।
বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, বাংলাদেশে জমির বিরোধ একটি বড় সমস্যা। সরকারগুলো এই বিরোধ নিষ্পত্তি সহজ করতে পারেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয়নি। ফলে জমির বিরোধের কারণে দেশে বহু সংঘর্ষ ও হত্যার ঘটনা ঘটছে।
অপরাধ নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, একেক ঘটনার কারণ একেক রকম। তবে প্রতিটির পেছনে সামাজিক ও কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি রয়েছে। পারিবারিক বিরোধ, সম্পদ, প্রভাব ও প্রতিশোধের প্রবণতার সঙ্গে অপরাধের ঘটনার দ্রুত তদন্ত এবং বিচার না হওয়াও এ ধরনের সহিংসতার অন্যতম কারণ।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছিলেন, দা হাতে এক যুবক দুপুর ১২টার দিকে ঘরে ঢুকে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করেন। এতে দুজনের মৃত্যু হয় ঘটনাস্থলেই। দুজন মারা যান হাসপাতালে। অভিযুক্ত যুবকের নাম অন্তর মজুমদার।
হত্যাকাণ্ডের পর পালানোর সময় অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে মারধর করে। এতে তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তর মজুমদার কেন চারজনকে কুপিয়ে হত্যা করলেন, তা এখনো অজানা। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অন্তর মাদকাসক্ত ছিলেন। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, মাদকের টাকার জন্যই এই হত্যাকাণ্ড হতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পাঁচ দিন পর আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় রায়পুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া বলেন, প্রায় সাত-আট বছর ধরে অন্তর মাদকাসক্ত। তিনি বাড়িতে মাদকের টাকার জন্য বাবা-মাকে মারধর করতেন।
এদিকে রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনার সঙ্গেও মাদককে সামনে এনেছে পুলিশ। গত শনিবার রাতে রংপুরের মাছুয়াপাড়ার বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) ও ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তীর (১২) লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।
এ ঘটনায় গত রোববার ভোরে মাছুয়াপাড়ার মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯) নামের দুই তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই দিনই সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার আবদুল মাবুদ দাবি করেন, বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে হত্যা করা হয়েছে।
যদিও এ ঘটনার আসল কারণ এটাই কি না, তা নিয়ে মানুষের সন্দেহ রয়েছে। মঙ্গলবার মামলাটি থানা থেকে পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) হস্তান্তর করা হয়।
চট্টগ্রামের আনোয়ারায় গত ২৫ জুলাই খুন হন স্বপন দাশ গুপ্ত (৬৫) ও তাঁর স্ত্রী কল্পনা দাশ গুপ্ত (৫৫)। হত্যার অভিযোগ তাঁদের একমাত্র ছেলে রিমন দাশ গুপ্তের বিরুদ্ধে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, মাদকাসক্ত রিমন দীর্ঘদিন ধরে বেকার। চাকরি নিয়ে তর্কের একপর্যায়ে বাবা-মাকে কুপিয়ে হত্যা করেন তিনি। অর্থাৎ, এ ঘটনায় মাদকাসক্তি ও বেকারত্বের মতো দুটি সামাজিক সমস্যা সামনে আসে।
সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিজ বাসায় ১২ আগস্ট সকালে ব্যবসায়ী আবদুস সাত্তার (৯০), তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) ও গৃহপরিচারিকা তাহমিনা (২০) খুন হন। এ ঘটনার দিন বিকেলেই পুলিশ রায়নগর এলাকা থেকে বাবুল মিয়া (৪০) নামের একজনকে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার বাবুল মিয়া রংমিস্ত্রি ও কসাইয়ের কাজ করতেন বলেও জানিয়েছিল পুলিশ। প্রাথমিকভাবে সিলেট মহানগর পুলিশের কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, গৃহপরিচারিকা তাহমিনার সঙ্গে ১৫-২০ দিনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল বাবুল মিয়ার। সম্পর্কে মনোমালিন্যের জেরে বাবলু মিয়া প্রথমে তাহমিনা এবং পরে দম্পতিকে খুন করেন। তবে পুলিশের এমন দাবি মানতে নারাজ ছিলেন নিহত দম্পতির স্বজনেরা।
হত্যাকাণ্ডের দুদিন পর নিহত দম্পতির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী মেয়ে সেলিনা সুলতানা সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় আটক বাবুলের নাম উল্লেখ করেননি। এজাহারে তিনি জমি নিয়ে বিরোধ এবং সে কারণে হত্যার অভিযোগ তুলেছিলেন। যদিও পুলিশ বলছে, ২০ আগস্ট ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন বাবুল মিয়া।
গত ছয় মাসে আত্রাইয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী-সন্তান হত্যা, দিনাজপুরে ছেলেদের বিরুদ্ধে বাবা-সৎভাই হত্যা, মানিকগঞ্জে দেবরের বিরুদ্ধে ভাবি-ভাতিজা হত্যা, রাজধানীর কলাবাগানে স্বামীর হাতে স্ত্রী-শাশুড়ি হত্যা এবং সুনামগঞ্জে বাবার বিরুদ্ধে দুই শিশুসন্তান হত্যার অভিযোগ এসেছে। গাজীপুরের কাপাসিয়ার পাঁচ খুনের এক আলোচিত ঘটনায় নিহত এক নারীর স্বামীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
প্রথম আলো যে ১৮টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে, তার মধ্যে ১২টি ঘটনায় একই পরিবারের দুজন করে নিহত হয়েছেন। একই পরিবারের তিনজন নিহত হয়েছেন দুই ঘটনায়, চারজন করে তিন ঘটনায় এবং পাঁচজন নিহত হয়েছেন এক ঘটনায়।
ছয় মাসের ১৮টি ঘটনার মধ্যে মে মাসেই ঘটেছে পাঁচটি। আগস্টের প্রথম ২৪ দিনেও স্বজনের সঙ্গে হত্যার শিকার হওয়ার পাঁচটি ঘটনা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, শুধু মে ও আগস্টেই ১০ ঘটনায় একই পরিবারের ২৭ জন নিহত হয়েছেন। ১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত সাতটি হুমকি ও বিরোধের তথ্য পাওয়া গেছে।
১৮টি ঘটনার মধ্যে অন্তত ১৪টি ঘটনা বাড়ি, ভাড়া বাসা, বসতঘর বা আবাসস্থলে ঘটেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ঘরেও কি মানুষ নিরাপদ নন।
পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, নিরাপত্তাবোধ আসলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থার প্রশ্ন। নিরাপত্তা শুধু রাস্তায় পুলিশের উপস্থিতির বিষয় নয়; একজন মানুষ যখন নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করেও নিরাপদ বোধ করেন, তখনই প্রকৃত অর্থে আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন, ঘরের ভেতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তাই পুলিশ খুব গুরুত্বের সঙ্গে দেখে। আর এই অপরাধের একটি অংশ এখন ব্যক্তিগত বিরোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধ এবং পূর্বশত্রুতার মতো বিষয় থেকে সংঘটিত হচ্ছে, যেগুলো অনেক সময় পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতির বাইরে ঘটে।
শাহাদাত হোসাইন বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করা নয়; অপরাধের কারণ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে তা প্রতিরোধ করা নিয়েও কাজ করছে পুলিশ।
অবশ্য মানুষ কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। যেমন গত ১৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জে ৭ বছরের এক শিশু হত্যার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সন্দেহভাজন কিশোরের পরিবারের ওপর হামলা চালায় বিক্ষুব্ধ লোকজন। গণপিটুনিতে ওই কিশোরের বাবা ও চাচা নিহত হন।
অপরাধবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হলে মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়। ‘হত্যা মামলার সাজার হার কম হওয়ার কারণ অনুসন্ধান’ শীর্ষক এক গবেষণায় ২৩৮টি মামলার তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) গত বছর মে মাসে জানিয়েছিল, ৫২ শতাংশ মামলায় সব আসামি খালাস পেয়েছেন।

0 Comments