রোবট মানুষের চেয়ে দ্রুত দৌড়াতে পারছে; কিন্তু সূক্ষ্ম কাজে কতটা দক্ষ

চীনের হিউম্যানয়েড বা মানবসদৃশ রোবটগুলো যে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির অ্যাথলেটের চেয়েও দ্রুত দৌড়াতে পারে, তা তারা দেখিয়ে দিয়েছে।

কিন্তু কোনো কিছু প্যাকেটজাতকরণ ও গুদামের কাজের পাশাপাশি বিদ্যুতের তার–সংযোগের মতো সূক্ষ্ম কাজ রোবট মানুষের মতো নিখুঁতভাবে করতে পারবে কি না, সেটিই এখন তাদের সামনে আসল পরীক্ষা।

শনিবার (২২ আগস্ট) থেকে বেইজিংয়ে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনের বিশ্ব হিউম্যানয়েড রোবট গেমস। এখানে মানুষের খেলাধুলার আদলে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা রয়েছে। পাশাপাশি সিমুলেটেড কারখানা, রেস্তোরাঁ, অফিস ও জরুরি পরিস্থিতিতে রোবটের সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্যও বিভিন্ন আয়োজন রাখা হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত এই আয়োজনে মোট ৫১টি ইভেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ৩০টি ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এবং ২১টি বিভিন্ন পরিস্থিতিভিত্তিক প্রতিযোগিতা। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব ইভেন্টের ৪০ শতাংশের বেশি রোবটকে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে।

হিউম্যানয়েড রোবট গেমসের এবারের আসরে ১০০ মিটার দৌড়ের বিজয়ী রোবটটির একই মডেলের আরেকটি রোবট ৪০০ মিটার দৌড়ে ৩৯ দশমিক ৭ সেকেন্ডে প্রতিযোগিতা শেষ করে। এতে আরেকটি নতুন রেকর্ড হয়। ভেঙে যায় দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েড ভ্যান নিকের্কের ৪৩ দশমিক ০৩ সেকেন্ডের বিশ্ব রেকর্ড।

দর্শক ও রোবোটিকস খাতে বিনিয়োগকারী শু ছিয়াওশেং বলেন, ‘গত বছরের চেয়ে এবার প্রতিযোগিতার তীব্রতা বেশি। এর ফলে রোবটের ব্যাটারি ব্যবস্থাপনা ও তাপনিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ছে।’

ছিয়াওশেং মনে করেন, ‘চীনের শিল্প খাতের উন্নয়নে এর (রোবটের) বিশাল গুরুত্ব রয়েছে।’

এবারের গেমসে কিছু রোবট দড়ি টানাটানি ও ভারোত্তোলন প্রতিযোগিতাতেও অংশ নিয়েছে। তাই চি ও ‘পিচ-পট’-এর মতো ঐতিহ্যবাহী চীনা খেলাতেও দেখা যাবে রোবটের অংশগ্রহণ। পিচ-পটে সরু মুখের পাত্রে তিরের মতো কাঠি ছুড়ে ফেলতে হয়।

দৃষ্টিনন্দন এসব প্রদর্শনীর বাইরে রোবটগুলো বাস্তব জগতের ছোটখাটো সমস্যা কতটা সামলাতে পারে, সেটিই হবে আরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। ছোটখাটো সমস্যার উদাহরণ হিসেবে কোনো বিদ্যুতের তার ভুল কোণে থাকা, কোনো কিছু হাতের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, প্যাকেটের অবস্থান বদলে যাওয়া কিংবা কাজের কোনো ধাপে ভুল করার কথা বলা যায়।

এসব পরীক্ষার মাধ্যমে রোবট কোনো বস্তু ঠিকভাবে শনাক্ত করতে পারে কি না, নির্ভুলভাবে হাত ও শরীরের অবস্থান ঠিক করতে পারে কি না, নিয়ন্ত্রিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করতে পারে কি না এবং মানুষের সাহায্য ছাড়া ভুল শুধরাতে পারে কি না, তা বোঝা যাবে।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লুমোস রোবোটিকসের প্রধান নির্বাহী ইউ চাও বলেন, এই প্রতিযোগিতা রোবটের হার্ডওয়্যার উন্নত করতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে শিল্পটির সক্ষমতাও তুলে ধরা সম্ভব। তবে রোবটগুলো বাস্তব জীবনের সমস্যা কতটা ভালোভাবে সমাধান করতে পারে, তার ওপরই দীর্ঘমেয়াদে এসব প্রতিযোগিতার গুরুত্ব নির্ভর করবে।

ইউ চাও আরও বলেন, ‘বাস্তব (জগতের) কাজের শেষ ধাপগুলোতে রোবট কাজ করতে পারলেই এর প্রকৃত মূল্য তৈরি হবে। শুধু দৌড়ানো আর লাফানো দক্ষতা বাড়ায় না।’

মানুষের খেলাধুলার আদলে তৈরি পরিচিত ইভেন্টগুলোর পাশাপাশি রোবটগুলো বৈদ্যুতিক গাড়িতে চার্জ দেওয়া, রেস্তোরাঁয় কাজ করা, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং হাতের সূক্ষ্ম নড়াচড়ার সক্ষমতা যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে। শিল্পকারখানায় যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানো ও মালামাল তোলার ইভেন্টও রয়েছে। বিদ্যুতের তার সংযোগের একটি প্রতিযোগিতায় রোবটের দৃষ্টিশক্তি, যান্ত্রিকভাবে সঠিক সংযোগ স্থাপন এবং শক্তিনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা যাচাই করা হবে।

বেইজিংভিত্তিক রোবট নির্মাতা স্টার্টআপ গ্যালবট জানিয়েছে, তারা স্বয়ংক্রিয় হিউম্যানয়েড রোবটের টেনিস ম্যাচ আয়োজন করবে। এতে একক ও দ্বৈত দুই ধরনের ম্যাচেই রোবট অংশ নেবে। বলের গতিপথ অনুসরণ, সার্ভ করা ও প্রতিপক্ষের শট ফেরানোর মতো কাজ করতে হবে তাদের।

রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জিরোথের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা হুয়া রং বলেন, প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পরই আসল পরীক্ষা শুরু হবে। তাঁর ভাষ্যমতে, পণ্যটি (রোবট) বিক্রি হওয়ার পর সেটি সত্যিই ব্যবহারকারীদের সমস্যার সমাধান করতে পারে কি না, (মূল) প্রতিযোগিতাটা হবে সেখানে।

Post a Comment

0 Comments