জ্বালানি খাতে নজিরবিহীন অপচয় ও অসম চুক্তি: আদানির বিদ্যুৎ চুক্তি বাতিলে আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট কোনো সাময়িক সরবরাহজনিত সমস্যা নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত ও গভীর দুর্নীতিপ্রসূত এক বিপর্যয়। সংকট নিরসনে সরকারের ভুল নীতি, অস্বচ্ছ সার্বভৌম চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে অসম চুক্তি বাতিলের আইনি উপায় নিয়ে সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ‘নেভিগেটিং দ্য এনার্জি ট্রানজিশন: ফরেন পলিসি অ্যালাইনমেন্ট অ্যান্ড জিওপলিটিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ শীর্ষক এই বৈঠকের আয়োজন করে ইনস্টিটিউট অব পলিসি, গভর্ন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি ফর ডেভেলপমেন্ট (আইপিজিএডি)।

অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তা হিসেবে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের (সোয়াস) অধ্যাপক মুশতাক খান বিদ্যুৎ খাতের ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা কাগজে-কলমে চার গুণ বাড়ানো হলেও বাস্তবে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১১ গুণ এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া বেড়েছে ২০ গুণ। জ্বালানি সরবরাহের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও কেবল সরকারি তহবিল থেকে কেন্দ্রভাড়ার বিপুল অর্থ লুটপাটের লোভে অসংখ্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অস্বাভাবিক।

ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি সার্বভৌম চুক্তির আইনি জটিলতা নিয়ে অধ্যাপক মুশতাক খান একটি কৌশলগত পথের নির্দেশনা দেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বকেয়া বিল নিয়ে সাধারণ আন্তর্জাতিক সালিশিতে (Arbitration) গেলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই হেরে যাবে, কারণ চুক্তির দলিলে তাদের পাওনা আইনিভাবে বৈধ করা আছে। এর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, চুক্তিটির শুরুতেই ব্যাপক দুর্নীতি ও নিয়মবহির্ভূত লেনদেন হয়েছিল। আইনি ভাষায় একে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ (Void ab initio) বা শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য চুক্তি বলা হয়। লন্ডনের কিংস কাউন্সিলের মতো বিশ্বমানের আইনজীবী এবং একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থার সহায়তা নিলে এই মামলায় বাংলাদেশের জেতার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এটি সাধারণ কোনো আমলাতান্ত্রিক কাজ নয় উল্লেখ করে তিনি শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরাসরি এই ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট তদারকির পরামর্শ দেন।

গোলটেবিল বৈঠকে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরাও জ্বালানি খাতের সার্বিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। কুইক রেন্টাল ও এলএনজি আমদানির নামে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় করা হয়েছে উল্লেখ করে জ্বালানি সাশ্রয়ে বাসাবাড়িতে ইনভার্টার এসি ও বিএলডিসি ফ্যান ব্যবহারের ওপর জোর দেন মোল্লা আমজাদ। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী ডিন সৈয়দ মিজানুর রহমান বলেন, অসাধু ব্যবসায়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেটের কারণে দেশের অর্থনীতি চরমভাবে শোষিত হয়েছে। প্রতিযোগিতা কমিশন তাদের দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা জানান, এসব অসম ও একপেশে চুক্তির কারণেই দেশের বাজেটে বিশাল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাসিমুল গনি বলেন, দেশের জ্বালানি অবকাঠামো যদি বিদেশি শক্তির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে তা সরাসরি সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত আনবে। বিআইআইএসএস-এর রিসার্চ ফেলো লাম-ইয়া মোস্তাক জানান, বাংলাদেশের মোট জ্বালানি আমদানির ২০ থেকে ২৩ শতাংশ আসে একক রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে, যা চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় চীনের মতো নবায়নযোগ্য বা সবুজ শক্তির দিকে দ্রুত স্থানান্তরিত হওয়ার বিকল্প নেই। সর্বশেষে, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ফেরদৌস বাপ্পী সংকট মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের কাছে সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য তুলে ধরার আহ্বান জানান।

Post a Comment

0 Comments