রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর: অনিশ্চিত ভবিষ্যতে বন্দি ১২ লাখ শরণার্থী

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নির্মম গণহত্যা ও বর্বরোচিত নির্যাতন থেকে প্রাণ বাঁচাতে ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার আজ ৯ বছর পূর্ণ হলো। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যে সামরিক অভিযানকে ‘গণহত্যার উদ্দেশ্যে’ পরিচালিত বলে বর্ণনা করা হয়েছিল, সেই ভয়াবহ স্মৃতি তাড়া করে বেড়াচ্ছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে। বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখে মানবেতর জীবনযাপন করছেন প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নজিরবিহীন তাণ্ডব, হত্যা, ধর্ষণ এবং ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের মুখে এই বিশাল জনগোষ্ঠী সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়েছিল। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দিয়ে তৎকালীন সময়ে বিপন্ন মানবতাকে রক্ষা করে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল। তবে সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই বৃহৎ সংকট এখন বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং নিরাপত্তার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে।

বর্তমানে কক্সবাজার ও ভাসানচরের ক্যাম্পগুলোতে দিনদিন মানবিক সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী নানা বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত সাহায্য ও সহায়তার পরিমাণও ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও শিক্ষার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে আশ্রয় শিবিরের বাসিন্দারা। একই সাথে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, মাদক পাচার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভ্যন্তরীণ সংঘাত স্থানীয় ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দীর্ঘ ৯ বছর অতিক্রান্ত হলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। মিয়ানমারের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং জান্তা সরকারের সদিচ্ছার অভাবে তাদের সম্মানজনক ও নিরাপদ প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও কার্যকর কূটনীতির অভাবে সংকটটি আজ দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্ব একা বহন করা সম্ভব নয়। অতি দ্রুত বিশ্বনেতাদের জোরালো কূটনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়াই এই গভীর সংকটের একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

Post a Comment

0 Comments