ইউরোপের বুকে শৈশবের বাংলাদেশ: জার্মানির লুবেনাউ ও পটসডামে এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার গল্প

বার্লিনকে কেন্দ্র করে ইউরোপ ভ্রমণের তৃতীয় পর্বে এবার আমাদের গন্তব্য জার্মানির দুই বৈচিত্র্যময় শহর—লুবেনাউ ও পটসডাম। ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সহায় ছিল ‘ডয়েচল্যান্ড-টিকিট’ (Deutschland-Ticket)। একটি মাত্র টিকিটে জার্মানির আঞ্চলিক ট্রেন, সাবওয়ে ও ট্রামে অবাধ যাতায়াতের এই অপরিসীম সুবিধা পুরো জার্নিকে করেছে অত্যন্ত সাশ্রয়ী, সহজ ও দুশ্চিন্তামুক্ত।

ইউরোপের আধুনিকতার মাঝে হঠাৎ এক টুকরো বাংলাদেশ খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়তো সচরাচর হয় না। তবে লুবেনাউ পৌঁছাতেই এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া আচ্ছন্ন করে ফেলে। সবুজ ঘাসে ঘেরা মাঠের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিশালাকার খড়ের গাদা বা ‘মেই’ দেখে মনে হলো, কয়েক মুহূর্তের জন্য ইউরোপ যেন মিলিয়ে গিয়ে ভেসে উঠেছে বাংলাদেশের কোনো এক নিভৃত গ্রাম। শৈশবে ধান কাটার পর খড়ের গাদায় লুকোচুরি খেলা, গোপন ঘাঁটি বানানো আর দূর থেকে মায়ের ডাক—সব স্মৃতির আগল যেন এক ঝটকায় খুলে গেল।

লুবেনাউ কেবল স্মৃতিমেদুরতার শহর নয়, এটি স্থানীয় স্প্রিওয়াল্ডের শসার আচারের বিখ্যাত রাজধানী বা ‘গুরকেনহাউপস্টাট’ (Gurkenhauptstadt) হিসেবেও পরিচিত। ক্যানাল বা খালের ধারে সাজানো কাঠের বাড়ি, সরবিয়ান (Sorbian) সংস্কৃতির ছোঁয়া আর এক অবিশ্বাস্য সততার নিদর্শন দেখা গেল এখানে। রাস্তার ধারে ছোট টেবিলে ফ্রেশ চেরি ও বেরির প্যাকেট সাজিয়ে রাখা, পাশে কেবল একটি ক্যাশবক্স—কোনো বিক্রেতা নেই! ক্রেতারা নিজের পছন্দ মতো ফল নিয়ে নিধার্রিত মূল্য বক্সে রেখে চলে যাচ্ছেন। ইউরোপের বুকে এই বিশ্বাস আর সততার দৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর।

লুবেনাউয়ের নৈসর্গিক রূপকথা পেরিয়ে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল পটসডাম। এটি এমন এক শহর, যেখানে রাজকীয় আভিজাত্য আছে কিন্তু কোনো অহংকার বা কোলাহল নেই। ডাচ কোয়ার্টারের লাল ইটের ঘর আর শান্ত ক্যাফেগুলো পার হয়ে আমরা পৌঁছাই ঐতিহাসিক সানসুসি প্রাসাদে। রাজা ফ্রেডরিক দ্য গ্রেটের এই প্রাসাদের সোনালি দেয়াল, ফোয়ারা, মার্বেল মূর্তি এবং সবুজ টেরেস মানুষকে এক নীরব প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য পটসডাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখানেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতির ভাগ্য নির্ধারণী ‘পটসডাম কনফারেন্স’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

শহরের কেন্দ্রস্থল ‘আল্টার মার্কেট’, দৃষ্টিনন্দন সেন্ট নিকোলাস চার্চ কিংবা সিটি প্যালেসের সামনে দাঁড়িয়ে এক পথশিল্পীর গিটারের সুর শুনছিলাম। চারপাশে অচেনা মানুষের ভিড়, অথচ সেই সুরে মিশে ছিল এক অদ্ভুত গভীরতা। ভ্রমণ শেষে অনেক স্থান হয়তো ধুলো জমে আবছা হয়ে যায়, কিন্তু লুবেনাউয়ের খড়ের গাদা, নির্জন ফল বিক্রির টেবিল আর পটসডামের সানসুসি প্রাসাদের নীরবতা চিরকাল মনে তাজা হয়ে থাকবে।

Post a Comment

0 Comments