
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে করা আবেদন নাকচের পরেও সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি বানানোর ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি নাকচ হওয়া আবেদনের তথ্য গোপন করেই রিফাইনারি পরিচালনায় ফের আবেদন করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাগো নিউজসহ আরেকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।-বিপিসির সচিব সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানা
কমিটি গঠনের জন্য পর্ষদে উপস্থাপিত দাপ্তরিক নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি পর্ষদে গোপন তথ্যে নোট উপস্থাপন করা কর্মকর্তাকে করা হয়েছে ওই কমিটির সদস্য সচিব।
এ বিষয়ে বিপিসির সচিব সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাগো নিউজসহ আরেকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।’
পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। অনুমোদন হওয়ার পর আমি নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠনের অফিস আদেশ করেছি।’
বিপিসির গঠিত কমিটিতে ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এ টি এম সেলিমকে আহ্বায়ক এবং অপারেশন ও বাণিজ্য শাখার উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেনকে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটিতে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদ, মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) ফেরদৌসী মাসুম হিমেল, মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) জাহিদ হোসাইন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মাসুদুল আলমকে সদস্য করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ‘কমিটি বর্ণিত সংবাদ পর্যালোচনা ও সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির প্ল্যান্ট পরিদর্শনপূর্বক প্ল্যান্টের প্রসেসিং ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসহ আগামী সাতদিনের মধ্যে বিপিসির চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে।’
বিপিসির এ চিঠিতে সংযুক্তি হিসেবে জাগো নিউজের ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শিরোনামসহ আরেকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের শিরোনাম উদ্বৃত আছে।
কমিটি গঠনের অনুমোদিত ওই নোট শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল নিয়ে প্রকাশিত অন্য একটি গণমাধ্যমের খবরের পাশাপাশি ২৩ আগস্ট জাগো নিউজে প্রকাশিত ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হলেও জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয় পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে।
নোটটিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি প্রতিষ্ঠানটি গত ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’ এর আলোকে বিদ্যমান রিফাইনারি হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত এবং প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন দাখিল করে।
উক্ত আবেদনের আলোকে জ্বাখসবির (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) ৩০/০৯/২০২৪ তারিখের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য বিপিসি প্রান্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদন ২০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে জ্বাখসবিতে পাঠানো হয়।
পরবর্তীসময়ে ২৯/০১/২০২৬ তারিখে দাখিল করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বাখসবি ০৩/০২/২০২৬ তারিখে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’ এর আলোকে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চিঠি পাঠায়।’
জাগো নিউজের হাতে আসা নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখের আবেদনের পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিপিসির ওই সময়ের মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বিপিসি।
ওই কমিটিকে প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শনসহ প্রতিষ্ঠানটির (এসপিএল) আবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে কমিটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন ব্যবস্থাপককে কো-অপ্ট করা হয়। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সাত সদস্যের কমিটির সদস্যরা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে জুলধা ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির সিআরইউ প্ল্যান্ট এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেন। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল বিপিসি চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন জমা দেন সাত সদস্যের সেই কমিটি।
এরপর ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে বিপিসি ওই প্রতিবেদনটি জমা দেয়। পরের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখের আবেদনটি নাকচ করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেডের (এসপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অবগত করা হয়।
আবেদন নাকচের আড়াই মাস পরে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দিয়ে বেসরকারি নীতিমালা-২০২৩ মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনায় পুনরায় আবেদন করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।
ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘এসপিএল ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বার্ষিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি স্থাপন করছে। এই রিফাইনারি স্থাপনান্তে এসপিএলের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন। পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ক্রুড ডিস্টিলিয়েশন ইউনিটের (সিডিইউ) সঙ্গে ডিজেল হাইড্রোট্রিয়েটার ইউনিট, রিসিডিউ ডিসালফারাইজেশন ইউনিট ও আইসোমারাইজেশন ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে।’
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২৯ জানুয়ারির আবেদনের পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি ওই বিষয়ের মতামত চেয়ে বিপিসিকে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আবেদন পর্যালোচনা করা হয়।
সভার কার্যবিবরণীতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রস্তাব নাকচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়- ‘ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে ইতোপূর্বে বাস্তবায়িত এসপিএম প্রকল্পের পুরোপুরি ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে সরকারিভাবে জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা তিনগুণ বাড়বে।’
‘এরই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি (এসপি পিএলসি) অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন মর্মে পরিচালকমণ্ডলি একমত পোষণ করেন।’
কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়- ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি গত ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে জ্বাখসবিতে পাঠানো চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ ২৮.০০.০০০০.০০০.০২৬.৯৯.০০৬৫.২০.৪৪৯ স্মারকমূলে উক্ত কোম্পানির প্রস্তাব নাকচ করা হয়।
জ্বাখসবি বর্ণিত পত্রের মাধ্যমে বলা হয়- ‘বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের জন্য কনডেনসেট নীতিমালা, ২০১৪ এর অনুচ্ছেদ-৮(ঘ) অনুযায়ী সংগৃহীত/আমদানি করা কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রাপ্ত পেট্রোল/অকটেন/ডিজেল/কেরোসিন/এলপিজি কোনোভাবেই সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা যাবে না।’
জাগো নিউজের হাতে আসা সুপার পেট্রোকেমিক্যালের দ্বিতীয় আবেদন ও বিপিসির গত ২৩ আগস্টের নোট শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আবেদনের চিঠির কোথাও প্রথমবার নাকচ হওয়া আবেদনের বিষয়টি উল্লেখও করা হয়নি। আগের চিঠির সূত্রও উল্লেখ করা হয়নি। সেই একই তথ্যই গোপন করে বিপিসির পর্ষদে কমিটি গঠনের নোট শিট উপস্থাপন করে বিপিসির অপারেশন বিভাগ।
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।-বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন
নোটটি উপস্থাপন করেন বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন। ধারাবাহিকভাবে নোটে স্বাক্ষর করেন একই বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. ইসতিয়াক হোসেন ও বিভাগ প্রধান মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন। এরপর পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের সই হয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধান নোটটি অনুমোদন করেন এবং সাতদিনের সময় দিয়ে পত্র জারির জন্য বিপিসি সচিবকে নির্দেশনা দেন।
পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের বিষয়ে কথা হলে কমিটির সদস্য সচিব বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘এখন কমিটি গঠন হয়েছে। কমিটি নিশ্চয়ই পুরো বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গ যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে ফোন করা হলে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে বিপিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনজুর আলম প্রধানের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এমডিআইএইচ/এএসএ
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। পাশাপাশি নাকচ হওয়া আবেদনের তথ্য গোপন করেই রিফাইনারি পরিচালনায় ফের আবেদন করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। জাগো নিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে।
অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাগো নিউজসহ আরেকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।-বিপিসির সচিব সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানা
কমিটি গঠনের জন্য পর্ষদে উপস্থাপিত দাপ্তরিক নোটে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি পর্ষদে গোপন তথ্যে নোট উপস্থাপন করা কর্মকর্তাকে করা হয়েছে ওই কমিটির সদস্য সচিব।
এ বিষয়ে বিপিসির সচিব সরকারের উপসচিব শাহিনা সুলতানা জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপারেশন বিভাগ থেকে নোট অনুমোদন হয়েছে। তারাই কমিটির সদস্য নির্ধারণ করে নোট উপস্থাপন করেছে। নোট অনুমোদন হওয়ার পর কমিটি গঠন করা হয়েছে। জাগো নিউজসহ আরেকটি মিডিয়ার প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সাত দিনের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।’
পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমি জানি না। অনুমোদন হওয়ার পর আমি নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠনের অফিস আদেশ করেছি।’
বিপিসির গঠিত কমিটিতে ঊর্ধ্বতন মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) এ টি এম সেলিমকে আহ্বায়ক এবং অপারেশন ও বাণিজ্য শাখার উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেনকে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটিতে বিপিসির মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মোরশেদ হোসাইন আজাদ, মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) ফেরদৌসী মাসুম হিমেল, মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য ও অপারেশন্স) জাহিদ হোসাইন এবং ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসির উপমহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মাসুদুল আলমকে সদস্য করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, ‘কমিটি বর্ণিত সংবাদ পর্যালোচনা ও সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসির প্ল্যান্ট পরিদর্শনপূর্বক প্ল্যান্টের প্রসেসিং ক্ষমতা বৃদ্ধি ও অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যসহ আগামী সাতদিনের মধ্যে বিপিসির চেয়ারম্যান মহোদয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে।’
বিপিসির এ চিঠিতে সংযুক্তি হিসেবে জাগো নিউজের ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শিরোনামসহ আরেকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের শিরোনাম উদ্বৃত আছে।
কমিটি গঠনের অনুমোদিত ওই নোট শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল নিয়ে প্রকাশিত অন্য একটি গণমাধ্যমের খবরের পাশাপাশি ২৩ আগস্ট জাগো নিউজে প্রকাশিত ‘আবেদন নাকচের পরেও রিফাইনারি বানাচ্ছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করা হলেও জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয় পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে।
নোটটিতে উল্লেখ করা হয়, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি প্রতিষ্ঠানটি গত ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’ এর আলোকে বিদ্যমান রিফাইনারি হিসেবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত এবং প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি চেয়ে আবেদন দাখিল করে।
উক্ত আবেদনের আলোকে জ্বাখসবির (জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ) ৩০/০৯/২০২৪ তারিখের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়ে মতামত দেওয়ার জন্য বিপিসি প্রান্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির প্রতিবেদন ২০ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে জ্বাখসবিতে পাঠানো হয়।
পরবর্তীসময়ে ২৯/০১/২০২৬ তারিখে দাখিল করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে জ্বাখসবি ০৩/০২/২০২৬ তারিখে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, প্রক্রিয়াকরণ, পরিবহন ও বিপণন নীতিমালা-২০২৩’ এর আলোকে সুস্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন দাখিলের জন্য চিঠি পাঠায়।’
জাগো নিউজের হাতে আসা নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখের আবেদনের পর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর বিপিসির ওই সময়ের মহাব্যবস্থাপক (বণ্টন ও বিপণন) জাহিদ হোসাইনকে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করে বিপিসি।
ওই কমিটিকে প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি সরেজমিনে পরিদর্শনসহ প্রতিষ্ঠানটির (এসপিএল) আবেদন পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরে কমিটিতে ইস্টার্ন রিফাইনারির একজন ব্যবস্থাপককে কো-অপ্ট করা হয়। ২০২৫ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি সাত সদস্যের কমিটির সদস্যরা কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে জুলধা ইউনিয়ন এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির সিআরইউ প্ল্যান্ট এবং প্রস্তাবিত প্রকল্পের স্থান পরিদর্শন করেন। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল বিপিসি চেয়ারম্যানকে প্রতিবেদন জমা দেন সাত সদস্যের সেই কমিটি।
এরপর ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে বিপিসি ওই প্রতিবেদনটি জমা দেয়। পরের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অপারেশন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখের আবেদনটি নাকচ করে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল লিমিটেডের (এসপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালককে অবগত করা হয়।
আবেদন নাকচের আড়াই মাস পরে ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর চিঠি দিয়ে বেসরকারি নীতিমালা-২০২৩ মোতাবেক কার্যক্রম পরিচালনায় পুনরায় আবেদন করেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার।
ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘এসপিএল ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বার্ষিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতাসম্পন্ন ক্রুড অয়েল রিফাইনারি স্থাপন করছে। এই রিফাইনারি স্থাপনান্তে এসপিএলের বার্ষিক উৎপাদন ক্ষমতা দাঁড়াবে ১৫ লাখ ৪৬ হাজার ৩৮১ মেট্রিক টন। পরিবেশবান্ধব ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে ক্রুড ডিস্টিলিয়েশন ইউনিটের (সিডিইউ) সঙ্গে ডিজেল হাইড্রোট্রিয়েটার ইউনিট, রিসিডিউ ডিসালফারাইজেশন ইউনিট ও আইসোমারাইজেশন ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে।’
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ২৯ জানুয়ারির আবেদনের পর গত ৩ ফেব্রুয়ারি ওই বিষয়ের মতামত চেয়ে বিপিসিকে চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। সেই চিঠির ওপর ভিত্তি করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় সুপার পেট্রোকেমিক্যালের আবেদন পর্যালোচনা করা হয়।
সভার কার্যবিবরণীতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রস্তাব নাকচের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়- ‘ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্পটি ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে ইতোপূর্বে বাস্তবায়িত এসপিএম প্রকল্পের পুরোপুরি ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে সরকারিভাবে জ্বালানি তেল পরিশোধন সক্ষমতা তিনগুণ বাড়বে।’
‘এরই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি (এসপি পিএলসি) অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিপূর্বক মজুত, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি তেল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিপণনের অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি আরও গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন মর্মে পরিচালকমণ্ডলি একমত পোষণ করেন।’
কার্যবিবরণীতে আরও উল্লেখ করা হয়- ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি গত ২৫/০৯/২০২৪ তারিখে জ্বাখসবিতে পাঠানো চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় থেকে গত ১৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ ২৮.০০.০০০০.০০০.০২৬.৯৯.০০৬৫.২০.৪৪৯ স্মারকমূলে উক্ত কোম্পানির প্রস্তাব নাকচ করা হয়।
জ্বাখসবি বর্ণিত পত্রের মাধ্যমে বলা হয়- ‘বেসরকারি পর্যায়ে স্থাপিত ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্টের জন্য কনডেনসেট নীতিমালা, ২০১৪ এর অনুচ্ছেদ-৮(ঘ) অনুযায়ী সংগৃহীত/আমদানি করা কনডেনসেট প্রক্রিয়াকরণ করে প্রাপ্ত পেট্রোল/অকটেন/ডিজেল/কেরোসিন/এলপিজি কোনোভাবেই সরাসরি অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত করা যাবে না।’
জাগো নিউজের হাতে আসা সুপার পেট্রোকেমিক্যালের দ্বিতীয় আবেদন ও বিপিসির গত ২৩ আগস্টের নোট শিট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আবেদনের চিঠির কোথাও প্রথমবার নাকচ হওয়া আবেদনের বিষয়টি উল্লেখও করা হয়নি। আগের চিঠির সূত্রও উল্লেখ করা হয়নি। সেই একই তথ্যই গোপন করে বিপিসির পর্ষদে কমিটি গঠনের নোট শিট উপস্থাপন করে বিপিসির অপারেশন বিভাগ।
সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।-বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন
নোটটি উপস্থাপন করেন বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন। ধারাবাহিকভাবে নোটে স্বাক্ষর করেন একই বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. ইসতিয়াক হোসেন ও বিভাগ প্রধান মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন। এরপর পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের সই হয়ে বিপিসির চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মনজুর আলম প্রধান নোটটি অনুমোদন করেন এবং সাতদিনের সময় দিয়ে পত্র জারির জন্য বিপিসি সচিবকে নির্দেশনা দেন।
পর্ষদে উপস্থাপিত নোটে তথ্য গোপনের বিষয়ে কথা হলে কমিটির সদস্য সচিব বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের উপ-ব্যবস্থাপক তানজিন হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের রিফাইনারি করার প্রথম আবেদন নাকচ হওয়ার বিষয়টি অন্য একটি গোপনীয় চিঠিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জ্ঞাত করা হয়েছে। তাই কমিটি গঠনের নোট শিটে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘এখন কমিটি গঠন হয়েছে। কমিটি নিশ্চয়ই পুরো বিষয়গুলো পূর্ণাঙ্গ যাচাই বাছাই করে প্রতিবেদন দেবে।’
এ বিষয়ে কথা বলতে ফোন করা হলে বিপিসির পরিচালক (অপারেশন্স) এ কে মোহাম্মদ সামছুল আহসানের মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া গেছে। পরে বিপিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মনজুর আলম প্রধানের ব্যক্তিগত ও দাপ্তরিক মোবাইল ফোনে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
এমডিআইএইচ/এএসএ

0 Comments