সংঘাত-নৈতিক অবক্ষয়ের বিস্তার ঠেকাতে মহানবীর আদর্শ অনুসরণের বিকল্প নেই

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে পক্ষকালব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি বলেছেন, আজকের বিশ্বে হিংসা, সংঘাত, অসহিষ্ণুতা, বৈষম্য, উগ্রতা, মিথ্যা ও নৈতিক অবক্ষয়ের যে বিস্তার ঘটছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের পূর্ব সাহানে ইসলামিক ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সারা বিশ্বের মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র ও মহিমান্বিত সময়। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব, বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি তিনি অগণিত সালাম ও দরুদ জানান।

তিনি বলেন, মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েত, মুক্তি ও কল্যাণের জন্য সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তার আগমন মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় ঘটনা। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ।

রাষ্ট্রপতি বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ বিশ্বমানবতার জন্য চিরন্তন পথনির্দেশ। তার চরিত্রে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও পরম মমত্ববোধের অনন্য সমন্বয় ঘটেছিল। দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি তিনি ছিলেন মমতাশীল। নারী, শিশু, প্রতিবেশী ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে গেছেন।

ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ভাষা, অঞ্চল কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে কোনো মানুষকে অবজ্ঞা করা যাবে না উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায় ও ইনসাফের সমাজ গঠনই ছিল মহানবী (সা.)-এর অন্যতম শিক্ষা।

তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার চরিত্রে উত্তম।’ মহান আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর অনুপম চরিত্রের প্রশংসা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর এই পবিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও শিক্ষা ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সততা, নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ গুরুত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

তিনি বলেন, মহানবী (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণে মানবমর্যাদা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, ন্যায়বিচার ও পারস্পরিক অধিকারের যে মহান শিক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, তা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা সর্বজনীন, চিরন্তন ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, তার মাধ্যমে মানবজাতির শান্তি, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার অনুপম বিধান ও আদর্শ ইসলাম ধর্মকে পরিপূর্ণতা দান করেছে। মহানবী (সা.)-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা প্রকাশের উপায় হলো কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে জীবন, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা।

ধর্মীয় সম্প্রীতির ওপর গুরুত্ব

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক উজ্জ্বল ঐতিহ্যের দেশ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ দেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করে আসছে।

মহানবী (সা.) অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সমন্বয়ে যে সমাজব্যবস্থা, পারস্পরিক অধিকার ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, জাতীয় জীবনেও শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তা অনুসরণীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, সেই দৃষ্টান্তকে পাথেয় করেই এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে ধর্মপ্রাণ মানুষ স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করবেন, সব ধর্মের মানুষ নিরাপদ ও সম্মানজনক জীবনযাপন করবেন এবং ন্যায়বিচার, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও পারস্পরিক সৌহার্দ রাষ্ট্র ও সমাজের ভিত্তি হবে।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উদ্যোগ তুলে ধরলেন রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে জাতীয় জীবনের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেই অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধানের প্রস্তাবনায় ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ সংযোজন করেন। তিনি চারটি বিভাগীয় শহরে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন করেন।

রাষ্ট্রপতি বলেন, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ইমামদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজকল্যাণ ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার কার্যক্রমও শুরু হয়। এজন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘ইমাম প্রশিক্ষণ অ্যাকাডেমি’।

পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন এবং ২০০১ সালে ইমাম-মুয়াজ্জিন কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

এসব উদ্যোগের মাধ্যমে মসজিদ, ইমাম, ধর্মীয় শিক্ষা এবং সমাজে ইসলামী নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছে বলে জানান রাষ্ট্রপতি।

২০৩০ সালের আগে সব উপাসনালয় সম্মানী ভাতার আওতায় আসার আশা

বর্তমান সরকার ধর্মীয় নেতাদের মর্যাদা বৃদ্ধি ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ইতোমধ্যে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া শুরু হয়েছে। অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে সেবাদানকারীদেরও সম্মানী ভাতা দেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের আগে প্রতিশ্রুতি অনুসারে দেশের সব মসজিদসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয় মাসিক সম্মানী ভাতার আওতায় আসবে।

আলেম-ওলামাদের ভূমিকা রাখার আহ্বান

আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখদের ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, মসজিদের মিম্বর থেকে তাঁরা কোটি মানুষের কাছে সত্য, ন্যায়, সততা, ভ্রাতৃত্ব ও মানবতার বাণী পৌঁছে দেন।

সমাজ থেকে দুর্নীতি, মাদক, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ, গুজব, হিংসা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং অসহিষ্ণুতা দূর করতে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও নবী করিম (সা.)-এর জীবনাদর্শ তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করতে আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখদের প্রতি আহ্বান জানান রাষ্ট্রপতি।

তিনি বলেন, বিভেদ, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ কোনো জাতিকে শক্তিশালী করে না। অতীতের কর্তৃত্ববাদ, ফ্যাসিবাদ ও অন্যায় যেন আর কখনো ফিরে না আসে, সে জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে অনুসরণ করে এবং ধর্মের শান্তি, ন্যায় ও সম্প্রীতির মর্মবাণীকে হৃদয়ে ধারণ করে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভূমিকার প্রশংসা

অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য আয়োজকদের বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন দীর্ঘদিন ধরে দেশের ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামী সংস্কৃতি, গবেষণা, প্রকাশনা, মসজিদভিত্তিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত এ ধরনের কর্মসূচি ইসলামের শান্তি, সৌহার্দ ও মানবকল্যাণের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিশেষে রাষ্ট্রপতি বলেন, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সত্য, ন্যায়, সততা, সহিষ্ণুতা, ক্ষমা, সাম্য ও মানবপ্রেমের মহান আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করতে হবে। ধর্মের নামে বিভেদ-বৈষম্য নয়, ইসলামের শান্তি ও মানবতার বাণী ছড়িয়ে দিতে হবে।

তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক কামনা করেন। একই সঙ্গে দেশ ও জাতিকে সব অনিষ্ট, বিভেদ ও অশান্তি থেকে রক্ষা করে বাংলাদেশকে শান্তি, ন্যায়, সাম্য, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দোয়া করেন।

রাষ্ট্রপতি পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে আয়োজিত পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন এবং সব কর্মসূচির সার্বিক সফলতা কামনা করেন।

অনুষ্ঠানে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) এমপি সভাপতিত্ব করেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ শামীম কায়সার এমপি, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব, দেশের বিশিষ্ট আলেম-ওলামা ও পীর-মাশায়েখ, গণমাধ্যমকর্মী এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা।

কেএইচ/কেএইচকে

Post a Comment

0 Comments