মিসরে ৩০০ বছর ধরে একই সমাধিতে রাখা হয়েছে মমি, নতুন অনুসন্ধান

প্রাচীন মিসরের মমি বললে অনেকে ভাবে জমকালো কাঠের বাক্সে হাত ভাঁজ করে শুয়ে থাকা কোনো রাজার মমি। ৩ হাজার বছরের পুরোনো মিসরীয় সভ্যতায় এটি কেবল একটি নিয়ম ছিল। তবে যুগের সঙ্গে সঙ্গে তাদের এই শেষকৃত্যের নিয়ম কীভাবে বদলেছে, তা জানতে গবেষকেরা গবেষণা করেছেন। তবে এর জন্য তাঁদের বহু জায়গায় খোঁজাখুঁজি করতে হয়নি। মিসরের প্রাচীন শহর লাক্সরের কাছে একটি মাত্র সমাধিকক্ষে ৩০০ বছরের বেশি সময় ধরে রাখা বিভিন্ন মমি পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি স্পেনের লা লাগুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের একটি লেখা প্রকাশ পেয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিওলজি’ সাময়িকীতে। গবেষণায় জানানো হয়, লাক্সরের থিবান নেক্রোপলিসের একটি সমাধিকক্ষে অন্তত ২০ জন মানুষ ও একটি কুকুরের মমি করা দেহাবশেষ মিলেছে। থিবান নেক্রোপলিস হলো ৪০০টির বেশি সমাধি নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বড় এলাকা। প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যারেড কারবালো-পেরেজ জানান, এই মমিগুলো এলোমেলোভাবে রাখা হয়নি। বরং সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থেকে সাজিয়ে রাখা হয়েছিল।

কারবালো-পেরেজ বলেন, শরীরগুলোর বিন্যাস দেখে বোঝা যায় যে এগুলো কোনো বিশৃঙ্খলভাবে ফেলা রাখা স্তূপ ছিল না। পুরোনো মমিগুলোর কথা মাথায় রেখেই নতুন মমিগুলো সেখানে সাবধানে রাখা হতো। এটি তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি সম্মান দেখানোর একটি বিশেষ উপায় ছিল।

প্রাচীন মিসরীয়রা কীভাবে অতীতকে সম্মান জানাত, তা জানতে বিজ্ঞানীরা গবেষণা শুরু করেন। তাঁরা দেখতে চান মিসরীয়রা কীভাবে সমাধিস্থলগুলোর নতুন ভাবে ব্যবহার করত। এ জন্য প্রত্নতাত্ত্বিকেরা প্রথমে ‘টিটি ২০৯’ নামের সমাধিটি খনন করেন। এটি ৭৫৪-৬৫৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে তৈরি করা হয়েছিল। সময়টি নুবিয়ান বা কুশীয় সাম্রাজ্যের ২৫তম রাজবংশ নামে পরিচিত।

বিজ্ঞানী দল ভেতরের প্রতিটি মমির ছবি তোলেন। তাঁরা মমির নকশা আঁকেন ও সেগুলো কীভাবে সাজানো ছিল, তা বিস্তারিত লিখে রাখেন। এখানে তাঁরা মোট ৯টি ভিন্ন সমাধিস্থল খুঁজে পান। সেগুলোয় একা এবং দলবদ্ধভাবে রাখা মমি ছিল। মমির পাশে নানা রকম জিনিসপত্রও পাওয়া যায়। এই গবেষণা থেকে বোঝা যায়, পরের প্রজন্মগুলোর কাছে এই ঘরের ভেতরের জায়গাটি কতটা মূল্যবান হয়ে উঠেছিল।

লা লাগুনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশরবিদ ও গবেষণার সহলেখক মিগেল অ্যাঞ্জেল মলিনেরো পোলো। তিনি জানান, এই ঘরে সবচেয়ে আগে যাঁদের সমাহিত করা হয়েছিল, তাঁরা সমাজপতি বা উঁচু সামাজিক মর্যাদার মানুষ ছিলেন। কারণ, তাঁদের মমি জাঁকজমকপূর্ণ কফিন, বিশেষ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার নানা মূল্যবান জিনিসের সঙ্গে রাখা হয়েছিল।

এক জায়গায় দেখা যায়, একটি মমি করা কুকুরকে সরাসরি এক পুরুষ ও নারীর মমির ওপর রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে জ্যারেড কারবালো-পেরেজ বলেন, ‘বিষয়টি বেশ চমৎকার। এতে বোঝা যায়, মানুষের সঙ্গে প্রাণীটির খুব গভীর ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল, যা আমরা সহজেই অনুভব করতে পারি।’

সরবিদ মিগেল অ্যাঞ্জেল মলিনেরো পোলো বলেন, ‘খাড়াভাবে রাখা এসব মমির কোনো কাঠের কফিন ছিল না, তবে সেগুলোকে খুব যত্ন নিয়ে মমি করা হয়েছিল। এসব মমির পাশাপাশি কিছু খাড়া মাটির কলসি পাওয়া গেছে, যা থেকে বোঝা যায় তখনকার সময়ে বিশেষ কোনো নিয়ম মানা হতো।’

এর আগে ধারণা করা হতো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন মিসরের সমাধিস্থলগুলো মৃতদেহে ভরে গিয়ে বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু টিটি ২০৯ সমাধিটি প্রমাণ করে, ৩০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বজনদের শেষকৃত্যে শ্রদ্ধা ও যত্নের কোনো অভাব ছিল না।

সূত্র: পপুলার সায়েন্স

Post a Comment

0 Comments