গাজায় সীমান্ত পেরোলেও মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না ত্রাণ: মূল বাধা ভেঙে পড়া পরিবহন ব্যবস্থা

গাজায় মানবিক সহায়তার ট্রাক প্রবেশের সংবাদের আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা। সীমান্তে কিছু ত্রাণের লরি প্রবেশের অনুমতি পেলেও তা প্রায়শই পৌঁছাচ্ছে না অনাহারী ও দুর্দশাগ্রস্ত ফিলিস্তিনিদের হাতে। মূল কারণ, গাজাজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনীর সংহারী হামলা ও কঠোর অবরোধের ফলে অভ্যন্তরীণ পরিবহন ব্যবস্থা এবং বিতরণ শৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থা 'ইউরো-মেড হিউম্যান রাইটস মনিটর'-এর তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে গাজায় পণ্য ও ত্রাণ পরিবহনে প্রায় ১,২০০টি যানবাহন সচল ছিল। অথচ বর্তমানে তার অতি সামান্য অংশই সচল রয়েছে। অন্তত ১৫০টি যানবাহন পুরোপুরি ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। খুচরো যন্ত্রাংশ, চাকা, ইঞ্জিন অয়েল এবং জ্বালানির তীব্র সংকটে গাজার মেকানিক ও চালকেরা বাধ্য হয়ে বিকল গাড়ি থেকে যন্ত্রাংশ খুলে অন্য গাড়ি সচল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন। এক বিকল লরি থেকে জ্বালানি ছেঁচে অন্য লরিতে ঢেলে কোনোমতে একেকটি গাড়িকে রাস্তায় সচল রাখা হচ্ছে।

মিশরের রাফা ক্রসিং বা অন্যান্য সীমান্ত দিয়ে ত্রাণের ট্রাক গাজায় ঢোকার পর সালাহ আল-দিন বা উপকূলীয় আল-রশিদ সড়কের মতো বিপর্যস্ত পথ ধরে মূল গুদাম বা বিতরণ কেন্দ্রে যেতে হয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এসব সড়কে পথিমধ্যে একটি গাড়ি বিকল হওয়া মানেই পুরো ত্রাণের চালান আটকে যাওয়া। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর সাধারণত কতগুলো ট্রাক গাজায় ঢুকছে সেটির ওপর থাকলেও, আসল সংকট লুকিয়ে আছে সীমান্ত থেকে বিতরণ কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানোর এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ পথটিতে।

কেবল যান্ত্রিক সংকটই নয়, ত্রাণ সরবরাহকারী চালকদের জীবনও প্রতিদিন চরম ঝুঁকিতে থাকছে। খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দিতে গিয়ে অনেক চালক ইসরায়েলি বাহিনী এবং তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। আহমেদ আসলিম নামের এক তরুণ চালকের উদাহরণ টেনে তাঁর পরিবার জানায়, অনাহারী মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে গিয়ে কীভাবে তিনি ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

সামগ্রিক পরিস্থতি বিচারে এটি স্পষ্ট যে, গাজার ভেতর নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জ্বালানি এবং চালকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে ত্রাণের বহর কেবল সীমান্ত পার হয়ে কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। ফলে খাবার ও ওষুধের অপেক্ষায় থাকা লাখ লাখ ফিলিস্তিনির হাহাকার ও দীর্ঘ প্রতীক্ষা আরও দীর্ঘতর হচ্ছে।

Post a Comment

0 Comments