গাদ্দাফি পতনের ১৫ বছর: বিভাজন ভুলে ঐক্যের নতুন পথে লিবিয়া?

মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের দেড় দশক পর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সংঘাত কাটিয়ে লিবিয়া কি তবে ঐক্যের নতুন আলো দেখতে পাচ্ছে? এক দশকেরও বেশি সময় পর সম্প্রতি দেশটির দুটি প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ যৌথভাবে প্রায় ১৯০ বিলিয়ন দিনার (প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বাজেট অনুমোদন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট এই যৌথ বাজেট লিবিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন সামলে দুই প্রধান শক্তির মধ্যে নতুন এক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

২০১১ সালে স্বৈরাচারী শাসক গাদ্দাফির পতনের পর থেকে লিবিয়া এক চরম শূন্যতা ও গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে। এতে দেশে সৃষ্টি হয় দুটি আলাদা শাসনকেন্দ্র—একদিকে রাজধানী ত্রিপোলিভিত্তিক আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অন্তর্বর্তী সরকার এবং অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলীয় বেনগাজি ও তোব্রুকভিত্তিক খলিফা হাফতারের সামরিক বাহিনী সমর্থিত প্রশাসন। ২০১২ সালের নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হলেও পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০২১ সালের নির্বাচন প্রক্রিয়া থমকে যায়। ফলে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক বলয় বছরের পর বছর ধরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মূল রণক্ষেত্রের যুদ্ধ স্তিমিত হয়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সমঝোতার চিত্র ফুটে উঠছে। বিশাল খনিজ তেলের রিজার্ভ থাকা সত্ত্বেও বন্দর অবরোধ ও রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে লিবিয়ার অর্থনীতি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেলের অবকাঠামো বন্ধ থাকার ফলে লিবিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শত শত কোটি ডলারের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তাছাড়া বর্তমানে স্থানীয় দিনারের মান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। এই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মুখে পড়ে উভয় পক্ষই এখন তেল রফতানি সচল রাখতে এবং রাজস্ব বণ্টনে নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে।

সামরিক ক্ষেত্রেও কিছু অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা গেছে। চলতি বছরের এপ্রিলে সির্তে অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন এক সামরিক মহড়ায় পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের সৈন্যরা এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছে। পূর্বাঞ্চলের প্রভাবশালী কমান্ডার খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতার এবং ত্রিপোলির উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদেল সালাম জুবি যৌথভাবে এই পদক্ষেপের প্রশংসা করেন। অবশ্য দুই মূল শিবিরের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি থাকলেও, নিজ নিজ বলয়ের অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড এখনো উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।

টানা তিনটি ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের পর লিবিয়ার সাধারণ জনগণের মধ্যে নতুন কোনো সংঘাতের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। রাজনৈতিক সংকটের পূর্ণাঙ্গ সমাধান না হলেও অর্থনৈতিক স্বার্থে এই দরকষাকষি ও রাজস্ব ভাগাভাগি শেষ পর্যন্ত একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা বা নির্বাচনের পথ সুগম করবে কিনা, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

Post a Comment

0 Comments