আটলান্টিকের রহস্যময় ‘কোল্ড ব্লব’: বিশ্ব জলবায়ুর জন্য কি বড় কোনো প্রলয়ের আভাস?

বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে পুরো পৃথিবী যখন তীব্র দাপদাহে পুড়ছে, ঠিক তখনই উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে দেখা মিলেছে এক বিপরীত ও রহস্যময় পরিস্থিতির। গত দেড় শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পূর্বে মহাসাগরের একটি নির্দিষ্ট অংশের তাপমাত্রা উল্টো প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে গেছে। বিজ্ঞানীদের কাছে পিন্ডাকৃতির এই শীতল এলাকাটি ‘কোল্ড ব্লব’ (Cold Blob) নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও, এই শীতল বলয়ের নেপথ্যে লুকিয়ে রয়েছে এক ভয়াবহ জলবায়ু বিপর্যয়ের চরম সংকেত।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, উত্তর আটলান্টিকের এই ব্যতিক্রমী শীতলতা আসলে মহাসাগরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি ‘আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন’ বা ‘অ্যামক’ (AMOC) নামের স্রোতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে গ্রিনল্যান্ডের বরফ গলে বিপুল পরিমাণ মিষ্টি পানি মহাসাগরের নোনা পানিতে মিশছে। এতে পানির ঘনত্ব কমে গিয়ে সাগরের স্বাভাবিক সঞ্চালন প্রক্রিয়া ধীরগতির হয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এই স্রোতপ্রবাহ যদি একটি সংকটময় সীমা অতিক্রম করে, তবে ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ স্থবিরতা নেমে আসতে পারে। একই সঙ্গে এশিয়া ও আফ্রিকার কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত জরুরি মৌসুমি বায়ু এবং বৃষ্টিপাত মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের জলবায়ুবিজ্ঞানী স্টেফান রাহমস্টর্ফের সাম্প্রতিক গবেষণা থেকে জানা গেছে, এই শীতলতা কেবল সমুদ্রের উপরিভাগে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পানির তলদেশে প্রায় এক কিলোমিটার গভীর পর্যন্ত বিস্তৃত। স্যাটেলাইট ও বিভিন্ন সাগরে ভাসমান বয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করে তিনি জানান, বায়ুমণ্ডলের প্রভাবে নয়, বরং মহাসাগরের নিজস্ব উষ্ণ স্রোত কম পৌঁছানোর কারণেই এই অঞ্চলের তলদেশ শীতল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে ‘সাবপোলার জাইর’ নামক সামুদ্রিক ঘূর্ণিস্রোতও ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে, যা বিশ্ব আবহাওয়াকে আরও অস্থির করে তুলবে।

তবে চরম আশঙ্কার বিষয় হলো, যখন এই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পরিবর্তনগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সবচেয়ে বেশি জরুরি, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি 'ওশান অবজারভেটিজ ইনিশিয়েটিভ'-এর বাজেট মারাত্মকভাবে কাটছাঁট করা হচ্ছে। বাজেট স্বল্পতার কারণে সমুদ্রের তলদেশের স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা সংকুচিত হয়ে পড়লে সাগরের তলার পরিবর্তনগুলো ধরা অসম্ভব হয়ে পড়বে। বিজ্ঞানীদের মতে, গভীর সমুদ্রের এই রহস্যময় শীতলতা আসলে জলবায়ু বিপর্যয়ের এক নীরব হুঙ্কার, যা সময়মতো মোকাবিলা করতে না পারলে মানবজাতিকে চড়া মূল্য চোকাতে হতে পারে।

Post a Comment

0 Comments