মঙ্গলের চাঁদ 'ডিমোস' দেখতে আলুর মতো কেন? মহাজাগতিক সংঘর্ষের চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটন বিজ্ঞানীদের

লাল গ্রহ মঙ্গলের দুটি ক্ষুদ্রাকৃতির উপগ্রহ বা চাঁদের একটি 'ডিমোস'। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে এই বিশেষ উপগ্রহটি। সাধারণ চাঁদের মতো গোলাকার না হয়ে ডিমোস দেখতে অনেকটা বিশ্রী, এবড়োখেবড়ো আলুর মতো। কিন্তু কেন মঙ্গলের এই উপগ্রহের চেহারা এমন অদ্ভুত? সম্প্রতি সুইজারল্যান্ডের বার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল বিজ্ঞানী উন্নত কম্পিউটার মডেল ও সিমুলেশনের মাধ্যমে এই রহস্যের জট খুলেছেন। তাঁদের দাবি, বহু বছর আগে এক ভয়ংকর মহাজাগতিক সংঘর্ষের কারণেই ডিমোসের চেহারায় এমন অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে।

গ্রিক ভয়ের দেবতার নামানুসারে নামকরণ করা ডিমোস মঙ্গল গ্রহ থেকে প্রায় ২৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে। মঙ্গলের অন্য উপগ্রহ ফোবোসের পৃষ্ঠভাগ যেখানে অসংখ্য গর্তে ভরা, সেখানে ডিমোসের উপরিভাগ অনেকটাই মসৃণ। এর রহস্য উন্মোচনে গবেষকরা কম্পিউটারে প্রায় ১০০টিরও বেশি সম্ভাব্য পরিস্থিতির রূপরেখা তৈরি করে পর্যবেক্ষণ করেন। বিশ্লেষণ শেষে জানা যায়, আনুমানিক ৩২০ মিটার চওড়া একটি বিশাল গ্রহাণু প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে ডিমোসে সজোড়ে আঘাত করেছিল। এই প্রাণঘাতী ধাক্কাতেই উপগ্রহটির দক্ষিণ মেরুতে তৈরি হয় প্রায় ১০ কিলোমিটার বিস্তৃত এক বিশাল খাদ বা গর্ত।

গবেষকদের মতে, সংঘর্ষের প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে ডিমোসের পৃষ্ঠের পাথর ও ধুলাবালি আকাশে ছিটকে গিয়ে পুনরায় চাঁদের ওপর আস্তরণ হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে। ধূলিকণা ও পাথরের এই স্তরকে বলা হয় 'রেগোলিথ'। এই স্তরের পুরুত্ব কোথাও কোথাও ২০০ মিটার পর্যন্ত। নতুন ধুলার এই প্রলেপ ডিমোসের পুরোনো গর্তগুলোকে ঢেকে মসৃণ রূপ দিয়েছে। আঘাতটি চাঁদটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারেনি, কারণ ডিমোসের ভেতরের গঠন সম্পূর্ণ নিরেট পাথর নয়; বরং এটি অনেকটা শক্ত না হওয়া ভাঙা পাথরের স্তূপের মতো।

তবে ডিমোস আসলে মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণে আটকে পড়া কোনো গ্রহাণু, নাকি অতীতে মঙ্গলের বুকে অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর আঘাতে ছিটকে যাওয়া টুকরো দিয়ে গঠিত—তা এখনো নিশ্চিত নয়। এই রহস্যের চূড়ান্ত সমাধান দিতে পারে জাপানের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা জাক্সার (JAXA) 'মার্শিয়ান মুনস এক্সপ্লোরেশন' (এমএমএক্স) মিশন। চলতি বছরের শেষ নাগাদ উৎক্ষেপণ হতে যাওয়া এই মিশনটি ২০২৭ সালে মঙ্গলের চাঁদে পৌঁছে নমুনা সংগ্রহ করবে এবং ২০৩১ সালে তা পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। তখনই হয়তো ডিমোসের জন্ম ও এর বিবর্তনের প্রকৃত ইতিহাস উন্মোচিত হবে।

Post a Comment

0 Comments