এআই শেয়ারের মোহে সর্বস্বান্ত দক্ষিণ কোরিয়ার নবাগত বিনিয়োগকারীরা, রাজনৈতিক সংকটে প্রেসিডেন্ট

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা 'এআই' প্রযুক্তির সাম্প্রতিক জোয়ারে ভর করে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে যে রেকর্ড উত্থান দেখা দিয়েছিল, তা এখন চরম বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। এআই চালিত সেমিকন্ডাক্টর খাতের শেয়ার কেনার হিড়িকে সঞ্চয়ের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন দিশেহারা দেশটির লাখ লাখ নবাগত বিনিয়োগকারী। হঠাৎ করে বাজার ধসে পড়ায় অনেকের ব্যক্তিগত জীবন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এমনই একজন ভুক্তভোগী ত্রিশোর্ধ্ব সরকারি চাকরিজীবী ইউন-বি। আগামী বছরের এপ্রিলে তাঁর বিয়ে। সেই বিয়ের বাড়তি খরচ জোগাতে তিনি সঞ্চয়ের প্রায় পুরোটাই বাজারের জনপ্রিয় সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট 'এসকে হাইনিক্স' এবং মার্কিন চিপ খাতের ইটিএফে (ETF) বিনিয়োগ করেছিলেন। কিন্তু জুন মাসের শীর্ষ অবস্থান থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ারবাজার সূচক 'কোসপি' (KOSPI) প্রায় ৪০ শতাংশ পড়ে যাওয়ায় হাজার হাজার ডলার হারিয়েছেন তিনি। ইউন-বি বিষণ্ণ কণ্ঠে বলেন, "এখন আমি ভাবছি বিয়ের আয়োজন ছোট করব, নাকি মধুচন্দ্রিমা বাতিল করব।"

চলতি বছরের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিউং সাধারণ মানুষকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছিলেন। দীর্ঘদিনের স্থবির শেয়ারবাজারকে চাঙ্গা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপ্রধানের আশ্বাসে বিশ্বাস রেখে বাজারে বিপুল সংখ্যক নতুন বিনিয়োগকারীর সমাগম ঘটে। বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স এবং এসকে হাইনিক্সের চিপের বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব চাহিদার ওপর ভর করে কোসপি সূচক জুন মাসে রেকর্ড ৯,৩৮৫ পয়েন্টে পৌঁছায়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় দ্রুত পতন। মার্জিন লোন বা ঋণ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ 'লেভারেজড' পণ্যে বিনিয়োগ করার কারণে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়।

শেয়ারবাজারের এই তাণ্ডবের প্রভাব পড়েছে দেশের রাজনীতিতেও। প্রেসিডেন্ট লি-এর জনপ্রিয়তার হার টানা পাঁচ সপ্তাহ ধরে কমে ৪৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা তাঁর কার্যকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিরোধী দলগুলো এই পরিস্থিতিকে সরকারের চরম নীতিগত ব্যর্থতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সাবেক বিচারমন্ত্রী চো কুক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "সরকার শেয়ারবাজারকে একটি ক্যাসিনোতে পরিণত করেছে। তরুণ বিনিয়োগকারীরা সরকারের পাতা লিভারেজের ফাঁদে পড়ে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, যা থেকে হয়তো তারা কখনোই বের হতে পারবেন না।"

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, পুরো শেয়ারবাজারের অর্ধেকেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে মাত্র দুটি সেমিকন্ডাক্টর প্রতিষ্ঠান। কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর এত বেশি নির্ভরশীলতাই এই অস্থিতিশীলতার প্রধান কারণ। ভয়াবহ এই আর্থিক ক্ষতি সত্ত্বেও ইউন-বি-এর মতো তরুণ বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এখন আর একক কোনো খাতে নয়, বরং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দিয়ে ধস সামাল দেওয়ার পাঠ নিচ্ছেন দক্ষিণ কোরিয়ার উদীয়মান বিনিয়োগকারীরা।

Post a Comment

0 Comments