প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর স্থগিত: বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ ও টানাপোড়েন

নয়াদিল্লি ও ঢাকার মধ্যবর্তী সম্পর্কের বরফ সহজে গলছে না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রথম ভারত সফর আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পতন এবং ভারত গমনের পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যকার সম্পর্কে যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, এই সফর স্থগিত হওয়া তারই স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।

চলতি মাসেই নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ঢাকা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতে, এই ঘটনা সফরের উপযোগী কূটনৈতিক পরিবেশকে বিনষ্ট করেছে। ফলে আপাতত এই সফর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার (প্রত্যর্পণ) দাবিকে ঢাকা এখন দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করছে। ঢাকা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারতের মাটিতে বসে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি জানিয়েছে তারা বিদ্যমান আইনি ও প্রতিষ্ঠিত বিধিমালার আলোকে প্রত্যর্পণ আবেদনটি পরীক্ষা করে দেখছে।

কূটনৈতিক এই উত্তেজনার মাঝে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অবশ্যই 'পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়' উত্তীর্ণ হতে হবে। তিনি দুই দেশেরই একে অপরের স্বার্থকে সম্মান জানানোর ওপর জোর দেন। জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের বিষয়ে ঢাকার কোনো তাড়াহুড়ো নেই। তিনি উল্লেখ করেন, ১৫০০-র বেশি মানুষের আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত জুলাই অভ্যুত্থানের নতুন বাস্তবতাকে ভারতকে সঠিকভাবে অনুধাবন করতে হবে।

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ঢাকা এখন 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ভিত্তিতে নিজেদের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় মর্যাদা এবং সমতার নীতি অনুসরণে কূটনীতি পরিচালনা করছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে বহুমুখী করার চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ। এর বাইরেও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং অবৈধ পুশব্যাকের অভিযোগ দুই দেশের উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবেগ সরিয়ে রেখে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাওয়াই এখন উভয় দেশের জন্য একমাত্র কার্যকর পথ।

Post a Comment

0 Comments