সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে ক্রমাগত বাধা: সংকুচিত জনপরিসর কি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি?

সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জেলা পুলিশের একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান বাজানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরীক্ষা ও উচ্চ শব্দকে প্রাথমিক অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হলেও, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধা, হামলা বা তা পণ্ড করে দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এটি তারই একটি অংশ। এর আগে কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিল, চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধার সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনের ওপর আঘাত হানার ঘটনা ঘটেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব ঘটনার প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া ও দৃষ্টিভঙ্গি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার হামলা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্য নাগরিক সমাজকে স্তম্ভিত করেছে। তিনি বলেছেন, ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া এলাকাটা এমন যে গানবাজনা-সিনেমা বহু বছর ধরে তাদের মধ্যে নিষিদ্ধের মতো।’ একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর কাছ থেকে আসা এ ধরনের বক্তব্য পরোক্ষভাবে বিশৃঙ্খলাকারী ও আক্রমণকারীদের অবস্থানকেই বৈধতা দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যেখানে রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার, সাংস্কৃতিক চর্চা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সেখানে হামলাকারীদের আচরণকে 'স্থানিক বৈশিষ্ট্য' হিসেবে আখ্যা দেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা বহন করে। এটি মূলত সহিংস গোষ্ঠীকে আরও উসকে দেওয়ার নামান্তর।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সাংস্কৃতিক পরিসরের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক পরিসরও সমানভাবে সংকুচিত হচ্ছে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অর্থনৈতিক সংস্কারের দাবিতে কয়েকটি সংগঠনের একটি পূর্বঘোষিত সমাবেশ করার কথা ছিল। নিয়মমাফিকভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি থাকা সত্ত্বেও শেষ মুহূর্তে পুলিশ এই সমাবেশের অনুমতি দেয়নি। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, অংশগ্রহণকারী একটি সংগঠনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কেবল মামলার অজুহাতে ঐতিহাসিক শহীদ মিনারে মুক্ত মতপ্রকাশের রাজনৈতিক সভা বন্ধ করে দেওয়া চরম প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা। বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রায় প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দল বা তাদের নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকে। ফলে এই অজুহাত ভবিষ্যতে যেকোনো বিরোধী বা ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মসূচি বন্ধ করার মোঘল হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

জনপরিসর (Public Space) কেবল শহীদ মিনার বা কোনো নির্দিষ্ট খেলার মাঠ নয়; এটি মূলত নাগরিক অধিকার, সাংস্কৃতিক মুক্ত চর্চা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের উন্মুক্ত স্থান। গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রধান শর্তই হলো এই জনপরিসরের বৈচিত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষা করা। সমাজে গান, সিনেমা বা সংস্কৃতির আয়োজন যেমন চলবে, তেমনি তার সমালোচনা করার অধিকারও অপরের থাকবে—এই সহাবস্থান নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু প্রতিবাদের নামে হামলা করা এবং রাষ্ট্র কর্তৃক সেই হামলাকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া নাগরিকের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলে দেয়।

অতএব, কোনো প্রশাসনিক বা সামাজিক অজুহাতেই জনপরিসরকে সংকুচিত করার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা যদি হামলাকারীদের অবস্থানকে বৈধতা দিতে থাকেন এবং রাজনৈতিক অধিকার প্রয়োগে বাধা দেন, তবে তা কেবল গণতান্ত্রিক রূপান্তরকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং পুরো দেশের জন্য এক মারাত্মক সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Post a Comment

0 Comments