যুক্তরাষ্ট্রের অভূতপূর্ব নিষেধাজ্ঞার হুমকি, বিকল্প পথে অর্থনীতি সচল রাখতে মরিয়া ইরান

বাণিজ্য অবরোধ, সম্পদ বাজেয়াপ্ত এবং সমুদ্রপথে কড়াকড়ির পর এবার ইরানের ওপর আরও বড় ধরনের অর্থনৈতিক আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের এই নজিরবিহীন হুমকির মুখে নিজেদের অর্থনীতিকে যেকোনো মূল্যে টিকিয়ে রাখতে বিকল্প কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে তেহরান।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সম্প্রতি জানিয়েছেন, তেহরানের ওপর এমন কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসে আগে কখনো দেখা যায়নি। ট্রাম্প প্রশাসনও একই সুর মিলিয়ে ইরানকে চরম অর্থনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ওয়াশিংটন তেহরানকে 'আত্মসমর্পণের সাদা পতাকা' তোলার আহ্বান জানালেও সংঘাত বা যুদ্ধ দ্রুত সমাধানের কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই কঠোর চাপ সত্ত্বেও নতিস্বীকার করতে নারাজ ইরানের কর্তৃপক্ষ। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার এবং শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না সমুদ্রে অবরোধ প্রত্যাহার, বাজেয়াপ্ত সম্পদ মুক্ত করা এবং তেল খাতের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নিচ্ছে, ততক্ষণ কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধই থাকবে। বিশ্ববাজারে তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহ হতো এই রুট দিয়ে, যা বর্তমানে অবরুদ্ধ।

সমুদ্রপথে মার্কিন নৌ-অবরোধের কারণে ইরান এখন স্থলপথের বাণিজ্যের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র এবং শিল্পকারখানার কাঁচামাল আমদানির জন্য তেহরান বর্তমানে পাকিস্তান, তুরস্ক এবং কাস্পিয়ান সাগরের মাধ্যমে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য জোরদার করেছে।

জার্মানির মারবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিষয়ক অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান আল জাজিরাকে জানান, বর্তমান সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধের যৌথ চাপে ইরানের অর্থনীতিতে তীব্র পণ্য সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এখন তেহরানের সামনে দুটি পথ খোলা—হয় যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তিতে যাওয়া, না হয় অবরোধ ভাঙতে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাওয়া। ইরান আপাতদৃষ্টিতে দ্বিতীয় পথটির দিকেই এগোচ্ছে।

এদিকে ভিয়েনা ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ মাহদি গোদসি সতর্ক করে বলেছেন, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ইরানের জ্বালানি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চীন যদি ইরানের তেল কেনা অব্যাহত রাখে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চীনা ব্যাংক ও শোধনাগারগুলোর ওপরও কড়া পদক্ষেপ নিতে পারে। এর ফলে কেবল ইরান নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও তেল ও জ্বালানি সংকটের ব্যাপক প্রভাব পড়বে।

সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অবরুদ্ধতা, উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে ইরানের প্রায় ৯ কোটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখা ও জনগণের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বললেও, বহিঃশত্রুর চাপ এবং অভ্যন্তরীণ সংস্কার ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা আনা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।

Post a Comment

0 Comments