নিজকলমোহনার ঢেঁকিঘরে মার্কিন গবেষক: গ্রামবাংলার প্রসূতি বিদ্যা ও প্রবীণ ধাত্রীর অবিশ্বাস্য গল্প

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক ক্লারা লিন্ডেন এসেছেন বাংলাদেশের অজপাড়াগাঁ ‘নিজকলমোহনা’ গ্রামে। উদ্দেশ্য—তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ নারীদের প্রসবসংক্রান্ত প্রাচীন ধারণা, লোকজ বিশ্বাস ও প্রচলিত প্রথা নিয়ে গবেষণা করা। তার সঙ্গে দোভাষী হিসেবে যুক্ত হয়েছেন ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় শিক্ষার্থী মাহজাবিন খান। গ্রামে গিয়ে তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ ঘটে গ্রামের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ধাত্রী কাশমতি বেওয়ার সঙ্গে। জীর্ণ এক ঢেঁকিঘরের ছনের ছাউনির নিচে বসে উন্মোচিত হয় গ্রামবাংলার প্রসূতি বিদ্যা ও মাতৃত্বের এক অবিশ্বাস্য ও জটিল জগত।

কাশমতি বেওয়া অক্ষরজ্ঞানহীন। তবে হিসাবের খাতা হিসেবে তার কাছে রয়েছে একটি লম্বা দড়ি, যেখানে প্রতিটি প্রসবের বিনিময়ে একটি করে গিঁট দেওয়া আছে। এ পর্যন্ত ১৮২টি শিশু প্রসব করিয়েছেন তিনি। তার বিশ্বাস, ১০১টি শিশু প্রসব করাতে পারলে ‘এক হজের সওয়াব’ পাওয়া যায়। সন্তান ছেলে না মেয়ে হবে, কিংবা প্রসবের সময় কখন—তা গণনা করার জন্য কাশমতির রয়েছে নিজস্ব শাস্ত্রীয় গান ও মন্ত্র। গ্রামীণ সমাজে পুত্রসন্তান না হলে নারীর ওপর নেমে আসা তালাকের মতো সামাজিক বিপর্যয় ঠেকানোয় কাশমতির গণনাই যেন সেখানকার অনেক প্রসূতির শেষ ভরসা।

গবেষণার এক পর্যায়ে উঠে আসে ‘আব্বাস’ নামের এক বালকের জন্মবৃত্তান্ত, যা শুনে রীতিমতো শিহরিত হন গবেষক। কাশমতি জানান, সন্তান প্রসবের সময় অপবাতাস থেকে প্রসূতিকে রক্ষা করতে ঘরে রাখা হয় ছেঁড়া জাল এবং খারাপ জিনের আছর থেকে বাঁচাতে রাখা হয় একখণ্ড লোহা। তবে আব্বাসের জন্মের সময় তৈরি হয়েছিল চরম সংকট। জরায়ু থেকে শিশু বের হলেও সে কাঁদছিল না, আবার গর্ভফুলও আটকে যায়। সংকট কাটাতে কাশমতি প্রয়োগ করেন অদ্ভুত কিছু লোকজ শাস্ত্র। স্বামীর জাদুপ্রভাবে আটকে থাকা গর্ভফুল বের করার জন্য স্বামীকে বলা হয় পরনের লুঙ্গি উল্টে পরতে। অন্যদিকে বাচ্চার কানের কাছে সজোরে বাজানো হয় কাঁসার থালা। শেষ পর্যন্ত চুলায় কড়াই গরম করে, তাতে সদ্য নির্গত রক্তে জবুথবু গর্ভফুল ভাজতে শুরু করেন কাশমতি! আশ্চর্যজনকভাবে, সেই তাপে নড়ে ওঠে ও কেঁদে ওঠে নিথর শিশুটি।

এই গবেষণায় তিন নারীর তিন ধরনের মনস্তাত্ত্বিক রূপ ফুটে উঠেছে। মার্কিন গবেষক ক্লারা লিন্ডেনের কাছে এটি তার থিসিসের জন্য এক ‘অসাধারণ ও রোমাঞ্চকর তথ্য (Exotic Data)’। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের ঠান্ডা ও যন্ত্রনির্ভর পরিবেশের চেয়ে এই লোকজ পদ্ধতির বৈচিত্র্য তাকে মুগ্ধ করে। ধাত্রী কাশমতি বেওয়া প্রফুল্ল, কারণ জীবনে প্রথমবার কেউ তার জীবনের কথা এভাবে মন দিয়ে শুনছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত ও স্তম্ভিত হন দোভাষী মাহজাবিন। নিজের দেশের বুকেই এক অচেনা জগত আবিষ্কার করে তিনি উপলব্ধি করেন, এই সংস্কৃতির গভীরতা বুঝতে তার নিজেরই এখন একজন দোভাষীর প্রয়োজন। নিজকলমোহনার শান্ত দুপুরে শ্বেতাঙ্গ, বাদামি ও শ্যামবর্ণ—এই তিন নারীর মেলবন্ধনে ফুটে উঠেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, মাতৃত্ব এবং লোকজ সংস্কৃতির এক জটিল রূপ।

Post a Comment

0 Comments