‘অমর, অলৌকিক, অনবদ্য’: ট্র্যাকে ও মাঠের বাইরে দেখা উসাইন বোল্ট মহাকাব্য

২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকের সেই ঐতিহাসিক রাতটির কথা মনে পড়লে আজও রোমাঞ্চ জাগে। 'বার্ডস নেস্ট' স্টেডিয়ামের জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিলেন বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ক্রীড়া সাংবাদিক। ধাক্কাধাক্কি আর উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নোট নেওয়ার সেই বিচিত্র অভিজ্ঞতা আজও তাজা। তবে সেই ভিড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে যিনি ছিলেন, তিনি শুধু ট্র্যাকেই নয়, হাসির খোরাক জোগাতে এবং মুগ্ধতা ছড়াতে সংবাদ সম্মেলন কক্ষেও ছিলেন সমানে পারদর্শী। তিনি আর কেউ নন—স্প্রিন্ট জগতের অসামান্য জ্যামাইকান কিংবদন্তি উসাইন বোল্ট।

সেই রাতে বেইজিংয়ের ট্র্যাকে যা ঘটেছিল, তা ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্রীড়া দৃশ্য। ১০০ মিটার স্প্রিন্টের দৌড় শেষ হওয়ার প্রায় ২০ মিটার আগেই এদিক-ওদিকে তাকিয়ে হাত ছড়িয়ে দেওয়া, ফিনিশিং লাইনের ১০ মিটার আগেই বুক চাপড়ে নিজের জয় ঘোষণা করা—আর এসবের পরও ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ডে ভেসে ওঠা ৯.৬৯ সেকেন্ডের এক অবিশ্বাস্য বিশ্বরেকর্ড! ফিনিশিং লাইনের মাত্র দশ হাত দূরে বসে অলিম্পিক ইতিহাসের এই স্মরণীয়তম কীর্তি চোখের সামনে প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য হয়েছিল। মনে হয়েছিল, ট্র্যাকে যেন একই সাথে দুটি প্রতিযোগিতা চলছে—একটি বোল্টের নিজের সঙ্গে নিজের লড়াই, অন্যটি বাকি প্রতিযোগীদের মধ্যে দ্বিতীয় হওয়ার লড়াই।

ক্রিকেটে স্যার ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান সম্পর্কে বলা হতো, তিনি শতকে একবার আসা কোনো খেলোয়াড় নন, বরং খোদ এই খেলায় একবারই আবির্ভূত হওয়া প্রতিভা। বোল্টের ক্ষেত্রেও এই বাক্যটি শতভাগ প্রযোজ্য। অ্যাথলেটিকসের ইতিহাসে তিনি চিরকাল একমেবাদ্বিতীয়ম হয়েই থাকবেন। অলিম্পিকে 'স্প্রিন্ট ডাবল' ও 'ট্রিপল ট্রিপল'-এর মতো অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়ার পাশাপাশি ডোপিংয়ের নিকষ অন্ধকারে ডুবে যাওয়া অ্যাথলেটিকসকে সত্য ও সুন্দরের আলোয় ফিরিয়ে এনেছিলেন তিনি। নিষ্কলুষ থেকে যে দ্রুততম মানবে রূপান্তরিত হওয়া যায়, সেই হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস তিনিই ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।

ট্র্যাকের অলৌকিক কীর্তির বাইরে মানুষ বোল্ট ছিলেন দারুণ আমুদে ও প্রাণবন্ত। নিজে মুখে নিজেকে ‘লেজেন্ড’ বা ‘দ্য গ্রেটেস্ট’ বললেও তা কখনোই অহংকার বলে মনে হয়নি, কারণ ট্র্যাকে বারবার তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। তার হাসিখুশি চরিত্র আর সাংবাদিকদের সঙ্গে খুনসুটি পুরো পরিবেশকেই রঙিন করে তুলত। ক্যারিয়ারের শেষ মিটে তার রানিং শুতে লেখা ছিল—‘ফরএভার ফাস্টেস্ট’। পুরো ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বুঝতে দ্বিধা থাকে না, উসাইন বোল্টের মতো মহাতারকা মানবজাতি আর কোনোদিন দেখবে না।

Post a Comment

0 Comments