সার সিন্ডিকেটের কবলে আমন চাষ: কৃত্রিম সংকটে দিশেহারা কৃষক, হুমকির মুখে খাদ্যনিরাপত্তা

দেশে আমন ধান উৎপাদনের ভরা মৌসুমে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে অসাধু সার সিন্ডিকেট। সরকারের নির্ধারিত দামে চাহিদামতো সার না পেয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন দেশের প্রান্তিক কৃষকেরা। পরিবেশকদের (ডিলার) কাছে সার না পাওয়া গেলেও খোলাবাজারে চড়া দামে ঠিকই মিলছে সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত সার। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সেচ সংকটের ধাক্কা সামলে যখন কৃষকেরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, তখন সারের এই কৃত্রিম সংকট দেশের সার্বিক খাদ্যনিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাইয়ের টানা বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আমনের বীজতলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এর আগে প্রতিকূল আবহাওয়া ও ডিজেল সংকটে বোরো ধানের উৎপাদনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে পারেনি। ফলে চলতি আমন মৌসুমের ওপর ভর করেই দেশের খাদ্য পরিস্থিতির হিসাব কষা হচ্ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। রাজশাহী ও যশোরসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই ডিলাররা কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে কৃষকদের খালি হাতে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। কোথাও ইউরিয়া মিললে টিএসপি বা ডিএপি সারের দেখা মিলছে না। আবার দূর-দূরান্ত থেকে লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী সার। অথচ অসাধু ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে কালোবাজারে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি টাকা দিলেই সেই সার অনায়াসে পাওয়া যাচ্ছে।

গ্যাস ও জ্বালানি সংকটে স্থানীয় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি থাকতে পারে। তবে কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, সেই ঘাটতি এমন কোনো সংকট তৈরি করার কথা নয়। মূলত প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা একশ্রেণীর অসাধু ডিলার ভর্তুকির সার খোলাবাজারে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মাঝে মাঝে কিছু ডিলারকে নামমাত্র জরিমানা করা হলেও তা এই সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

ঋণ করে ফসল ফলানো কৃষকেরা সার, বীজ ও সেচের পেছনে বাড়তি টাকা খরচ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে তাদের উৎপাদন খরচ লাগামহীনভাবে বেড়ে যাচ্ছে, অথচ ফসল তোলার পর তারা কাঙ্ক্ষিত দাম পান না। এই শোষণমূলক দুষ্টচক্রের কারণে একদিকে যেমন কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের কৃষি খাত। সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা কেবল আইনগত অপরাধ নয়, এটি জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার বিরুদ্ধে বড় আঘাত। তাই অবিলম্বে কঠোর নজরদারি, অসাধু ডিলারদের লাইসেন্স বাতিল এবং সার সিন্ডিকেটের মূল উপড়ে ফেলে কৃষকবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের জোরালো তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

Post a Comment

0 Comments