
‘আমি যাচ্ছি চলে, কোনো দিন হয়তো আর আসব না! তবে যেটুকু নিয়ে গেলাম, তার প্রতিদান আমি দিতে পারব না!’ ২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট। সবে সন্ধ্যা নেমেছে রাষ্ট্র বাংলাদেশে। কিন্তু সে সন্ধ্যার কালো বাংলার আকাশ–বাতাসে যেন গাঢ়-নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। কেননা, বর্ণিল ও ঘটনাবহুল একটি জীবন যাপন করার পর এক মহাপ্রয়াণের মধ্য দিয়ে অলোকলোকে আবাস নেন কবিতা-শেরপা শামসুর রাহমান। তিনি কবিতা-শেরপাই বটে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির প্রধান কবি হিসেবে জীবদ্দশায়ই ছিলেন সর্বজনস্বীকৃত। শুধু তা–ই নয়, বাংলা সাহিত্যের কাব্যকাঠামোর নববিন্যাস বলতেই জ্ঞান করা হয় তাঁর কবিতাকে।
প্রগতির সূর্যসন্তান শামসুর রাহমান। কালের পথপরিক্রমায় জীবন ঘষে আগুন জ্বেলেছেন তিনি। ‘কালের ধুলোয় লেখা’র পূর্বলেখে উল্লেখ করেছেন, কস্মিনকালেও তিনি সন্ন্যাসী কিংবা দরবেশ হওয়ার কথা ভাবেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়’ পঙ্ক্তিতে। তাঁর যাপন করে যাওয়া জীবনটি ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য এবং তা অনুভব করার কৌতূহল তার মধ্যে ছিল প্রবল। তিনি অবশ্য মনে করতেন, ‘প্রত্যেক মানুষের জীবনই একটি অডেসি, কারও অডেসি ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য; কারও সেই পরিমাণ নয়।’ বিরল কবিদের একজন তিনি। ফলে কবিখ্যাতি পাওয়ার পরও তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশ করতে সময় নিয়েছেন প্রায় এক যুগ। এই সময় নেওয়ার পেছনে তাঁর নিজের কবিতার স্বতন্ত্র সুর ও শৈলীই প্রধান কারণ ছিল।
শামসুর রাহমান বাংলাদেশের বড় কবি বলে পরিগণিত হওয়ার কারণ হলো, এই জাতি ও ভাষার সমূহ বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। শামসুর রাহমানের কবিতার একটি বড় অংশের রূপ-রূপান্তরের ইতিহাস রাষ্ট্র বাংলাদেশের রূপ-রূপান্তরের ইতিহাসের সঙ্গে হাত–ধরাধরি করে চলেছে। অতীত, বর্তমান, বোধ, মেধা, মিথ, রাজনীতি, সমাজ ও সম্পর্ক একত্রে এসে মিলিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। কবি ও তাঁর সময়কে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়, শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্প–সাহিত্যের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর দ্রোহ কবিতায় প্রতিফলিত করতে হয়েছে। ফলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ‘হাতির শুঁড়’ কবিতা লিখেছেন; মুজিবকে ‘ইসরায়েলের স্যামশন’ অভিহিত করেছেন; কারাগারে অন্তরিণ শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে লিখেছেন ‘টেলেমেকাস’ কবিতাটিও।
১৯৬৭ সালের ২২ জুন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে সরকার–নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তানে কর্মরত থাকার পরও পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে শামসুর রাহমান রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বিবৃতিতে। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব দিলে মাতৃভাষার ওপর শোষকের খড়গের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েই কবি ক্ষান্ত হন না, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখেন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’র মতো হৃদয়স্পর্শী কবিতা।
উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ‘আসাদের শার্ট’-এর মতো স্বজাতির করোটিতে গুলিবিদ্ধ চির-অমর কবিতাটি লেখার পেছনের ঘটনাটি আজ সবারই জানা। কবি দেখেছিলেন, শতসহস্র প্রতিবাদকারী পুলিশের গুলিতে খুন হওয়া আসাদের রক্তমাখা শার্ট হাতে নিয়ে মিছিল করছিলেন। বেদনাহত কবির কাছে আসাদের রক্তমাখা শার্টটিকে জ্ঞান হলো আমাদের প্রাণের পতাকা, যে শার্ট গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো উড়ছিল হাওয়ায়, নীলিমায় আর কবির মস্তিষ্কে। যেন বোন তার ভাইয়ের সেই অম্লান শার্টে নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম লাগিয়ে দিয়েছে; ‘কখনো হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সূক্ষ্মতায়’। কিংবা ‘বর্ষিয়সী জননী কত কত দিন সে-শার্টটি উঠোনের রৌদ্রে মেলে দিয়েছেন স্নেহের বিন্যাসে’। লিখে ফেললেন কবি সেই রাতে অমর কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। আর এখানেই কবির মাহাত্ম্য: সেই শার্ট পতপত করে অবিরাম উড়ে চলেছে স্বাধীনতাকে ধারণ করা বাঙালির হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে; চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
[আসাদের শার্ট]
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ কেবল একটি ভৌগোলিক স্বাধীনতা আনেনি, বরং বাঙালি জাতিসত্তার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটিয়েছে। আর এ বিকাশ যে সহজে আসেনি, লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেসব বিষয় শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত করেছেন। উল্লেখ করতে হয়, শামসুর রাহমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা উচ্চমানের নান্দনিক শিল্পসুষমায় মণ্ডিত এবং ইতিহাসের সত্যে ভাস্বর। অবরুদ্ধ স্বদেশের বন্দিশিবিরের কান্না, বুড়িগঙ্গার ভেসে যাওয়া লাশ, পুড়তে থাকা গ্রাম আর স্বজনহারা মানুষের হাহাকার, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বাঙালির অদম্য চেতনা, বীরত্ব, প্রতিরোধ ও মুক্তির বজ্রকণ্ঠ তথা স্বাধীনতার শাশ্বত ছবি শামসুর রাহমানই এঁকেছেন।
কবিতায় মিথের ব্যবহার ও জাতীয়তাবাদী চেতনা শামসুর রাহমানের অদম্য সাহসের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগ্রন্থটিতে পুরাণ ব্যবহারের ধরনে স্পষ্টত দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতার চিহ্নসূত্র লুপ্ত করে দিয়েছেন। কবি বলেছেন, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?’ খাণ্ডবদাহন মিথটির ব্যবহার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলাকালীন জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্তর্গত সৌরভ-সুগন্ধির স্মারক হয়ে উঠেছিল। ‘প্রবেশাধিকার নেই’ কবিতায় দুর্বাসা, মুনি আর ‘প্রাত্যহিক’ কবিতায় ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের মিথ ব্যবহারের মধ্যেও আমরা শামসুর রাহমানের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার স্বরূপটি অনুধাবন করতে পারি।
বাংলা কবিতা ও সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি জ্ঞান করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলতে চাইলে; এর প্রতিবাদস্বরূপ; আমরা অনুধাবন করি, আমাদের কবির কলম থেকে যেন স্ফুলিঙ্গ বের হয়েছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে একই আবেগ আর স্বপ্নের ছায়ার নিচে নিয়ে এসেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। তবে স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল পিপাসিত সর্বস্তরের মানুষকে এককাতারে এবং একস্বপ্নে শামিল করানোর কাজটি করেছিল মূলত জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্যকার শ্রেণিচেতনা, যার কারণে স্বাধীনতাযুদ্ধে দ্বিধাহীনচিত্তে অস্ত্র ছাড়াই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল সর্বস্তরের মানুষকে। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতার বইটিতে উল্লেখ করেছেন স্বাধীনতার জন্য কারা অপেক্ষা করছে এবং আত্মত্যাগের জন্য কারা ঘর ছেড়েছে। হাড্ডিসার অনাথ কিশোরী, সগীর আলী, শাহবাজপুরের জোয়ান কৃষক, কেষ্টদাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা, মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি, রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, রাইফেল কাঁধে বনে–জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো তেজি তরুণেরা আত্মত্যাগের জন্য ঘর ছেড়েছেন। শামসুর রাহমানের জাতীয়তাবাদী একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, তিনি যখন স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেন গ্রাম্য মেয়ে থেকে শুরু করে মেধাবী শিক্ষার্থী কিংবা মজুর যুবাদের।
শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল যুদ্ধকালেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতার পর মাটি, মানুষ, সুন্দর ও স্বদেশকে আপন জ্ঞান করে নিজেকে জড়ভরত না রেখে কবির যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক স্বৈরাচারের উত্থানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। অপশাসকদের অপশাসনের সমুচিত জবাব দেওয়ার চিরন্তন অনুষঙ্গ কবিতার মাধ্যমে তিনি হাজির করেছেন মোক্ষম অস্ত্র ‘মেষতন্ত্র’। কবিতাটিতে দেখতে পাওয়া যায়, শাসক ও জনতাকে কেন্দ্র করে মেষ ও মালিক বিষয় দুটি এসেছে। জনতা কথা বলতে পারে না; তাদের মুখ বোবা; তারা শুধু শাসকের হুকুম পালন করে। যারা উজ্জ্বল করে রাষ্ট্রের মুখ, কিন্তু নির্মম পরিস্থিতি হলো, দিন-রাত-মাস-বছর চলে যায়, কিন্তু তারা টুঁ শব্দটিও করতে পারে না। শাসকের শোষণে জনতা অতিষ্ট ও নিরুপায় হয়ে দিনাতিপাত করে। কবি দেশের মানুষের কথা নিজের হৃদয়ে ধারণ করে লেখেন:
‘দিনদুপুরে ডাকাত পড়ে
পাড়ায় রাহাজানি, দশের দশায় ধেড়ে কুমির
ফেলছে চোখের পানি।’
[মেষতন্ত্র]
এদিকে, যে দেশের আপামর জনগণ যুদ্ধ করেছে নিজস্ব ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা, অথর্নীতি ও অধিকারের আশায়, সেই রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদের নীল ব্লেজারে আচ্ছাদিত থাকে নিশিদিন। স্বৈরাচার যায়, স্বৈরাচার আসে আর হরণ করে মানুষের অধিকার। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে দেশের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। শামসুর রাহমান সব সময়ই মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার পক্ষে অবিচল ছিলেন। ফলে এই চেতনাচ্যুতির বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন:
‘ভোরবেলা ঘন
কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেলে তার
মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে
যেখানে এখন কেউ কারও চেনা নয়, কেউ কারও
ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
[উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ]
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্প–সাহিত্যের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য শামসুর রাহমানকে তাঁর কালজয়ী দ্রোহ কবিতায় প্রতিফলিত করতে হয়েছে। নগরে জন্মলাভ ও জীবনযাপন করা কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় নাগরিক জীবনের পরাঙ্মুখ ছায়ার উন্মোচনও স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। নাগরিকতার অনুষঙ্গ হিসেবে শহুরে প্রেম, প্রকৃতি, পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমকালীন রাজনীতি প্রভৃতি বিষয় যেমন তাঁর কবিতায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে, আধুনিক কবিতার প্রধান সব বৈশিষ্ট্যকে—নাগরিক জীবনের হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, নৈরাশ্য, সংগ্রামমনস্কতা, মানসিক ক্লান্তি, শহুরে জল ও গরল ধারণ করা কবিতাও সমানভাবে উজ্জ্বল তাঁর কবিতায়। তবে অস্তিত্ববাদ শামসুর রাহমানের ভাবনার জগৎকে প্রভাবিত করেছে বেশি। কবি অবলোকন করেছেন, মানুষের জন্ম ও মৃত্যু একা এবং এই দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী সময়ে সে আসলে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরে সে একাই বাস করে। এই অস্তিত্বের সংকট ও শূন্যতাবোধ তাঁর কবিতাকে এক ভিন্ন গভীরতা দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ যখন নিজের ছায়ার মুখোমুখি হয়, তখন তার চেয়ে নিঃসঙ্গ আর কেউ থাকে না।
‘ইকারুশের আকাশ’ কবিতার বইটিতে কবি নিজেকে নাগরিক কবি হিসেবে ব্যক্তও করেছেন। ফলে শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করাটা সমীচীন। কিন্তু শুধুই নাগরিক কবি হিসেবে তাঁকে গণ্ডিবদ্ধ করাটা অসমীচীনই নয়, একদম অনুচিত। শামসুর রাহমান দীর্ঘ এক কবিজীবন যাপন করেছেন, যার কারণে তাঁকে নানাভাবে তাঁর অভিব্যক্তি বিধৃত করতে হয়েছে। শামসুর রাহমানের ‘মাতাল ঋত্বিক’-এর ‘আমিও বনের ধারে’, ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘আমার তৃষ্ণার জল’ সনেটগুলি ছাড়াও ‘রূপালি স্নান’, ‘কবিকে দিও না দুঃখ’, ‘দুঃখ পেতে থাকি’, ‘রেনেসাঁস’, ‘চাঁদ সদাগর’, ‘ইন্দ্রাণীর খাতা’, ‘এসো কোকিল’, ‘এসো স্বর্ণচাঁপা’, ‘কবিতা তোমার সঙ্গে’ প্রভৃতি কবিতায় স্পষ্টত অনুধাবন করা যায় শামসুর রাহমানের কবিত্বকলার প্রমত্ততা।
‘আমিও বনের ধারে মধ্যে-মধ্যে একা চলে আসি
শহর পেছনে ফেলে। কোলাহলহীন বেলা কাটে
ঘাসে বসে ঝিলের ঝিলিক আর বীতশস্য মাঠে
পাখি দেখে, শিস বাজে ঘন ঘন; ক্লান্ত শীর্ণ চাষী,
সূর্যসেঁকা, বৃক্ষতলে স্বপ্ন শোঁকে, আশ্রয়-প্রত্যাশী পান্থজল লম্বা পায়ে বসতির দিকে পথ হাঁটে এবং সূর্যের চোখ বুজে আসে মেঘাচ্ছন্ন ...।’
উল্লেখ করতে হয় শেষে: এই রাষ্ট্রের জন্য এটা দুঃখের যে শামসুর রাহমানের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর কোনো কবিকে প্রতিবাদ মিছিলের সম্মুখে পায়ে পা মিলিয়ে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে দেখার ভাগ্য হলো না! শামসুর রাহমানকে নিয়ে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন:
‘আধুনিক কবি শামসুর রাহমান আত্মপ্রকাশে তিরিশের উত্তরসূরি আধুনিক কবি ও কবিতাকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন। শামসুর রাহমান তো পঞ্চাশের কাব্যপ্রতিভা, তাই তাঁর স্বাতন্ত্র্য অবশ্যম্ভাবী। তিরিশের কবিতার কাব্যপ্রতিভার মধ্যে শামসুর রাহমান তার সঙ্গে গেঁথেছেন বাস্তবতা ও অব্যবহিত প্রতিবেশ ও সময়। শামসুর রাহমান সমকালে বিস্তৃত ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছেন। তার কবিতায় উঠে এসেছে জাতীয় চেতনার প্রতিটি দ্রোহ, উন্মাতাল, আবহ, উত্তাপ, গণমুক্তির মুখর শব্দমালা। শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি বাস্তব প্রতিবেশকে, ব্যাপক বিস্তৃত বাস্তবতাকে তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন নিজ স্বভাবে। তাইতো তিনি বাংলাদেশের একমাত্র প্রধান কবি রূপে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। পঞ্চাশের দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শূন্য দশক পর্যন্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শামসুর রাহমানের কবিতা যে চেতনা ও আকর্ষণের জোরেও দীপ্যমান, তা হলো তার কাব্যশৈলী, উপমা, প্রতীক, শিল্পরূপ, ভাষার সারল্য, আধুনিক কবিতার শব্দ ও চিত্রকল্প, কাব্যভাষার গৌরবময় ঐতিহ্য ও গভীর ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি তার কবিতাকে যুগে যুগে মানুষের সুখ ও দুঃখের সাথি করেছে।’
প্রগতির সূর্যসন্তান শামসুর রাহমান। কালের পথপরিক্রমায় জীবন ঘষে আগুন জ্বেলেছেন তিনি। ‘কালের ধুলোয় লেখা’র পূর্বলেখে উল্লেখ করেছেন, কস্মিনকালেও তিনি সন্ন্যাসী কিংবা দরবেশ হওয়ার কথা ভাবেননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়’ পঙ্ক্তিতে। তাঁর যাপন করে যাওয়া জীবনটি ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য এবং তা অনুভব করার কৌতূহল তার মধ্যে ছিল প্রবল। তিনি অবশ্য মনে করতেন, ‘প্রত্যেক মানুষের জীবনই একটি অডেসি, কারও অডেসি ঘটনাবহুল, বৈচিত্র্যময়, বর্ণাঢ্য; কারও সেই পরিমাণ নয়।’ বিরল কবিদের একজন তিনি। ফলে কবিখ্যাতি পাওয়ার পরও তাঁর প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’ প্রকাশ করতে সময় নিয়েছেন প্রায় এক যুগ। এই সময় নেওয়ার পেছনে তাঁর নিজের কবিতার স্বতন্ত্র সুর ও শৈলীই প্রধান কারণ ছিল।
শামসুর রাহমান বাংলাদেশের বড় কবি বলে পরিগণিত হওয়ার কারণ হলো, এই জাতি ও ভাষার সমূহ বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত হয়েছে। শামসুর রাহমানের কবিতার একটি বড় অংশের রূপ-রূপান্তরের ইতিহাস রাষ্ট্র বাংলাদেশের রূপ-রূপান্তরের ইতিহাসের সঙ্গে হাত–ধরাধরি করে চলেছে। অতীত, বর্তমান, বোধ, মেধা, মিথ, রাজনীতি, সমাজ ও সম্পর্ক একত্রে এসে মিলিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। কবি ও তাঁর সময়কে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হয়, শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্প–সাহিত্যের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁর দ্রোহ কবিতায় প্রতিফলিত করতে হয়েছে। ফলে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে বিদ্রুপ করে ‘হাতির শুঁড়’ কবিতা লিখেছেন; মুজিবকে ‘ইসরায়েলের স্যামশন’ অভিহিত করেছেন; কারাগারে অন্তরিণ শেখ মুজিবকে উদ্দেশ করে লিখেছেন ‘টেলেমেকাস’ কবিতাটিও।
১৯৬৭ সালের ২২ জুন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী রেডিও পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীত সম্প্রচার নিষিদ্ধ করলে সরকার–নিয়ন্ত্রিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তানে কর্মরত থাকার পরও পেশাগত অনিশ্চয়তার তোয়াক্কা না করে শামসুর রাহমান রবীন্দ্রসংগীতের পক্ষে স্বাক্ষর করেন বিবৃতিতে। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব পাকিস্তানের সব ভাষার জন্য অভিন্ন রোমান হরফ চালু করার প্রস্তাব দিলে মাতৃভাষার ওপর শোষকের খড়গের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েই কবি ক্ষান্ত হন না, এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখেন ‘বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা’র মতো হৃদয়স্পর্শী কবিতা।
উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে ‘আসাদের শার্ট’-এর মতো স্বজাতির করোটিতে গুলিবিদ্ধ চির-অমর কবিতাটি লেখার পেছনের ঘটনাটি আজ সবারই জানা। কবি দেখেছিলেন, শতসহস্র প্রতিবাদকারী পুলিশের গুলিতে খুন হওয়া আসাদের রক্তমাখা শার্ট হাতে নিয়ে মিছিল করছিলেন। বেদনাহত কবির কাছে আসাদের রক্তমাখা শার্টটিকে জ্ঞান হলো আমাদের প্রাণের পতাকা, যে শার্ট গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের জ্বলন্ত মেঘের মতো উড়ছিল হাওয়ায়, নীলিমায় আর কবির মস্তিষ্কে। যেন বোন তার ভাইয়ের সেই অম্লান শার্টে নক্ষত্রের মতো কিছু বোতাম লাগিয়ে দিয়েছে; ‘কখনো হৃদয়ের সোনালি তন্তুর সূক্ষ্মতায়’। কিংবা ‘বর্ষিয়সী জননী কত কত দিন সে-শার্টটি উঠোনের রৌদ্রে মেলে দিয়েছেন স্নেহের বিন্যাসে’। লিখে ফেললেন কবি সেই রাতে অমর কবিতা ‘আসাদের শার্ট’। আর এখানেই কবির মাহাত্ম্য: সেই শার্ট পতপত করে অবিরাম উড়ে চলেছে স্বাধীনতাকে ধারণ করা বাঙালির হৃদয়ের রৌদ্র-ঝলসিত প্রতিধ্বনিময় মাঠে; চৈতন্যের প্রতিটি মোর্চায়।
‘আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখণ্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।’
[আসাদের শার্ট]
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম অধ্যায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ যুদ্ধ কেবল একটি ভৌগোলিক স্বাধীনতা আনেনি, বরং বাঙালি জাতিসত্তার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটিয়েছে। আর এ বিকাশ যে সহজে আসেনি, লাখ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেসব বিষয় শামসুর রাহমান তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত করেছেন। উল্লেখ করতে হয়, শামসুর রাহমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কবিতা উচ্চমানের নান্দনিক শিল্পসুষমায় মণ্ডিত এবং ইতিহাসের সত্যে ভাস্বর। অবরুদ্ধ স্বদেশের বন্দিশিবিরের কান্না, বুড়িগঙ্গার ভেসে যাওয়া লাশ, পুড়তে থাকা গ্রাম আর স্বজনহারা মানুষের হাহাকার, আশা-আকাঙ্ক্ষা, বাঙালির অদম্য চেতনা, বীরত্ব, প্রতিরোধ ও মুক্তির বজ্রকণ্ঠ তথা স্বাধীনতার শাশ্বত ছবি শামসুর রাহমানই এঁকেছেন।
কবিতায় মিথের ব্যবহার ও জাতীয়তাবাদী চেতনা শামসুর রাহমানের অদম্য সাহসের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতাগ্রন্থটিতে পুরাণ ব্যবহারের ধরনে স্পষ্টত দেখা যায়, তিনি বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ থেকে সাম্প্রদায়িকতার চিহ্নসূত্র লুপ্ত করে দিয়েছেন। কবি বলেছেন, ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,/ তোমাকে পাওয়ার জন্যে/ আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায়?/ আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন?’ খাণ্ডবদাহন মিথটির ব্যবহার স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ চলাকালীন জাতীয়তাবাদী চেতনার অন্তর্গত সৌরভ-সুগন্ধির স্মারক হয়ে উঠেছিল। ‘প্রবেশাধিকার নেই’ কবিতায় দুর্বাসা, মুনি আর ‘প্রাত্যহিক’ কবিতায় ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের মিথ ব্যবহারের মধ্যেও আমরা শামসুর রাহমানের বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার স্বরূপটি অনুধাবন করতে পারি।
বাংলা কবিতা ও সংস্কৃতিকে হিন্দুয়ানি জ্ঞান করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আমাদের সংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলতে চাইলে; এর প্রতিবাদস্বরূপ; আমরা অনুধাবন করি, আমাদের কবির কলম থেকে যেন স্ফুলিঙ্গ বের হয়েছিল। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষকে একই আবেগ আর স্বপ্নের ছায়ার নিচে নিয়ে এসেছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা। তবে স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল পিপাসিত সর্বস্তরের মানুষকে এককাতারে এবং একস্বপ্নে শামিল করানোর কাজটি করেছিল মূলত জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্যকার শ্রেণিচেতনা, যার কারণে স্বাধীনতাযুদ্ধে দ্বিধাহীনচিত্তে অস্ত্র ছাড়াই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ঘর ছাড়তে বাধ্য করেছিল সর্বস্তরের মানুষকে। ‘বন্দী শিবির থেকে’ কবিতার বইটিতে উল্লেখ করেছেন স্বাধীনতার জন্য কারা অপেক্ষা করছে এবং আত্মত্যাগের জন্য কারা ঘর ছেড়েছে। হাড্ডিসার অনাথ কিশোরী, সগীর আলী, শাহবাজপুরের জোয়ান কৃষক, কেষ্টদাস, জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা, মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি, রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, রাইফেল কাঁধে বনে–জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো তেজি তরুণেরা আত্মত্যাগের জন্য ঘর ছেড়েছেন। শামসুর রাহমানের জাতীয়তাবাদী একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, তিনি যখন স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেন গ্রাম্য মেয়ে থেকে শুরু করে মেধাবী শিক্ষার্থী কিংবা মজুর যুবাদের।
শামসুর রাহমানের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কেবল যুদ্ধকালেই সীমাবদ্ধ নয়; স্বাধীনতার পর মাটি, মানুষ, সুন্দর ও স্বদেশকে আপন জ্ঞান করে নিজেকে জড়ভরত না রেখে কবির যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, সেই দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন, শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং পরবর্তী সময়ে সামরিক স্বৈরাচারের উত্থানের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি। অপশাসকদের অপশাসনের সমুচিত জবাব দেওয়ার চিরন্তন অনুষঙ্গ কবিতার মাধ্যমে তিনি হাজির করেছেন মোক্ষম অস্ত্র ‘মেষতন্ত্র’। কবিতাটিতে দেখতে পাওয়া যায়, শাসক ও জনতাকে কেন্দ্র করে মেষ ও মালিক বিষয় দুটি এসেছে। জনতা কথা বলতে পারে না; তাদের মুখ বোবা; তারা শুধু শাসকের হুকুম পালন করে। যারা উজ্জ্বল করে রাষ্ট্রের মুখ, কিন্তু নির্মম পরিস্থিতি হলো, দিন-রাত-মাস-বছর চলে যায়, কিন্তু তারা টুঁ শব্দটিও করতে পারে না। শাসকের শোষণে জনতা অতিষ্ট ও নিরুপায় হয়ে দিনাতিপাত করে। কবি দেশের মানুষের কথা নিজের হৃদয়ে ধারণ করে লেখেন:
‘দিনদুপুরে ডাকাত পড়ে
পাড়ায় রাহাজানি, দশের দশায় ধেড়ে কুমির
ফেলছে চোখের পানি।’
[মেষতন্ত্র]
এদিকে, যে দেশের আপামর জনগণ যুদ্ধ করেছে নিজস্ব ভাষা, সমাজ, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা, অথর্নীতি ও অধিকারের আশায়, সেই রাষ্ট্র কর্তৃত্ববাদের নীল ব্লেজারে আচ্ছাদিত থাকে নিশিদিন। স্বৈরাচার যায়, স্বৈরাচার আসে আর হরণ করে মানুষের অধিকার। নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে দেশের শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধ, দেশ ও দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। শামসুর রাহমান সব সময়ই মুক্তিযুদ্ধের ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক চেতনার পক্ষে অবিচল ছিলেন। ফলে এই চেতনাচ্যুতির বিরুদ্ধে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন:
‘ভোরবেলা ঘন
কুয়াশার তাঁবুতে আচ্ছন্ন চোখ কিছুটা আটকে গেলে তার
মনে হয় যেন সে উঠেছে জেগে সুদূর বিদেশে
যেখানে এখন কেউ কারও চেনা নয়, কেউ কারও
ভাষা ব্যবহার আদৌ বোঝে না; দেখে সে
উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ বিরানায়; মুক্তিযুদ্ধ,
হায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়, বৃথা যায়।’
[উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ]
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, শাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে শিল্প–সাহিত্যের একটি দেশ প্রতিষ্ঠার জন্য শামসুর রাহমানকে তাঁর কালজয়ী দ্রোহ কবিতায় প্রতিফলিত করতে হয়েছে। নগরে জন্মলাভ ও জীবনযাপন করা কবি শামসুর রাহমানের কবিতায় নাগরিক জীবনের পরাঙ্মুখ ছায়ার উন্মোচনও স্বাভাবিকভাবেই ঘটেছে। নাগরিকতার অনুষঙ্গ হিসেবে শহুরে প্রেম, প্রকৃতি, পরিবেশ-পরিস্থিতি, সমকালীন রাজনীতি প্রভৃতি বিষয় যেমন তাঁর কবিতায় উজ্জ্বলভাবে ফুটে উঠেছে, আধুনিক কবিতার প্রধান সব বৈশিষ্ট্যকে—নাগরিক জীবনের হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, নৈরাশ্য, সংগ্রামমনস্কতা, মানসিক ক্লান্তি, শহুরে জল ও গরল ধারণ করা কবিতাও সমানভাবে উজ্জ্বল তাঁর কবিতায়। তবে অস্তিত্ববাদ শামসুর রাহমানের ভাবনার জগৎকে প্রভাবিত করেছে বেশি। কবি অবলোকন করেছেন, মানুষের জন্ম ও মৃত্যু একা এবং এই দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী সময়ে সে আসলে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। মানুষ সমাজবদ্ধ জীব হলেও শেষ পর্যন্ত নিজের ভেতরে সে একাই বাস করে। এই অস্তিত্বের সংকট ও শূন্যতাবোধ তাঁর কবিতাকে এক ভিন্ন গভীরতা দিয়েছে। তিনি দেখিয়েছেন, মানুষ যখন নিজের ছায়ার মুখোমুখি হয়, তখন তার চেয়ে নিঃসঙ্গ আর কেউ থাকে না।
‘ইকারুশের আকাশ’ কবিতার বইটিতে কবি নিজেকে নাগরিক কবি হিসেবে ব্যক্তও করেছেন। ফলে শামসুর রাহমানকে নাগরিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করাটা সমীচীন। কিন্তু শুধুই নাগরিক কবি হিসেবে তাঁকে গণ্ডিবদ্ধ করাটা অসমীচীনই নয়, একদম অনুচিত। শামসুর রাহমান দীর্ঘ এক কবিজীবন যাপন করেছেন, যার কারণে তাঁকে নানাভাবে তাঁর অভিব্যক্তি বিধৃত করতে হয়েছে। শামসুর রাহমানের ‘মাতাল ঋত্বিক’-এর ‘আমিও বনের ধারে’, ‘আমার প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘আমার তৃষ্ণার জল’ সনেটগুলি ছাড়াও ‘রূপালি স্নান’, ‘কবিকে দিও না দুঃখ’, ‘দুঃখ পেতে থাকি’, ‘রেনেসাঁস’, ‘চাঁদ সদাগর’, ‘ইন্দ্রাণীর খাতা’, ‘এসো কোকিল’, ‘এসো স্বর্ণচাঁপা’, ‘কবিতা তোমার সঙ্গে’ প্রভৃতি কবিতায় স্পষ্টত অনুধাবন করা যায় শামসুর রাহমানের কবিত্বকলার প্রমত্ততা।
‘আমিও বনের ধারে মধ্যে-মধ্যে একা চলে আসি
শহর পেছনে ফেলে। কোলাহলহীন বেলা কাটে
ঘাসে বসে ঝিলের ঝিলিক আর বীতশস্য মাঠে
পাখি দেখে, শিস বাজে ঘন ঘন; ক্লান্ত শীর্ণ চাষী,
সূর্যসেঁকা, বৃক্ষতলে স্বপ্ন শোঁকে, আশ্রয়-প্রত্যাশী পান্থজল লম্বা পায়ে বসতির দিকে পথ হাঁটে এবং সূর্যের চোখ বুজে আসে মেঘাচ্ছন্ন ...।’
উল্লেখ করতে হয় শেষে: এই রাষ্ট্রের জন্য এটা দুঃখের যে শামসুর রাহমানের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আর কোনো কবিকে প্রতিবাদ মিছিলের সম্মুখে পায়ে পা মিলিয়ে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে যেতে দেখার ভাগ্য হলো না! শামসুর রাহমানকে নিয়ে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন:
‘আধুনিক কবি শামসুর রাহমান আত্মপ্রকাশে তিরিশের উত্তরসূরি আধুনিক কবি ও কবিতাকে অক্ষুণ্ন রেখেছেন। শামসুর রাহমান তো পঞ্চাশের কাব্যপ্রতিভা, তাই তাঁর স্বাতন্ত্র্য অবশ্যম্ভাবী। তিরিশের কবিতার কাব্যপ্রতিভার মধ্যে শামসুর রাহমান তার সঙ্গে গেঁথেছেন বাস্তবতা ও অব্যবহিত প্রতিবেশ ও সময়। শামসুর রাহমান সমকালে বিস্তৃত ও বাস্তবতাকে ধারণ করেছেন। তার কবিতায় উঠে এসেছে জাতীয় চেতনার প্রতিটি দ্রোহ, উন্মাতাল, আবহ, উত্তাপ, গণমুক্তির মুখর শব্দমালা। শামসুর রাহমানের কৃতিত্ব এখানেই যে তিনি বাস্তব প্রতিবেশকে, ব্যাপক বিস্তৃত বাস্তবতাকে তাঁর কবিতায় ধারণ করেছেন নিজ স্বভাবে। তাইতো তিনি বাংলাদেশের একমাত্র প্রধান কবি রূপে স্বীকৃতি অর্জন করেছেন। পঞ্চাশের দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শূন্য দশক পর্যন্ত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শামসুর রাহমানের কবিতা যে চেতনা ও আকর্ষণের জোরেও দীপ্যমান, তা হলো তার কাব্যশৈলী, উপমা, প্রতীক, শিল্পরূপ, ভাষার সারল্য, আধুনিক কবিতার শব্দ ও চিত্রকল্প, কাব্যভাষার গৌরবময় ঐতিহ্য ও গভীর ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি তার কবিতাকে যুগে যুগে মানুষের সুখ ও দুঃখের সাথি করেছে।’

0 Comments